আপনার সন্তান কি করছে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুকসানা আক্তার

(লন্ডন থেকে): আমার এক পরিচিত পরিবার তাদের এক বাচ্চা কে ইসলামিক স্কুলে পড়তে দিয়েছেন তখন, যখন সে মোটামোটি টেন গ্রেডে পড়ে। ইদানিং বাচ্চার মাকে দেখেছি ধর্মীয় কায়দা কানুন খুব অনুসরণ করছেন।বাচ্চাদের কে ও ধর্মীয় অনুশাসনে চালিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। সব দেখে শুনে  জিজ্ঞাস করেছিলাম  স্কুল শিক্ষা সমাপনের দ্বার প্রান্তে এসে এমন একটা সিদ্ধান্ত নেয়াটা কি ঠিক হয়েছে? উত্তর শুনে আমার কলিজা ঠান্ডা হয়ে গেল শোকে। বললেন যে, এই দেশে বাচ্চাদের ভালো মুসলিম হিসাবে তৈরি করতে এ ছাড়া আর কোন ভালো বিকল্প নেই।  মরার পর একদিন তো জবাব দিতে হবে বাচ্চাদের কি বানিয়ে এসেছেন।ভাবলাম হয়তো ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাচ্চাদের শিক্ষা থেকে শুরু করে চলা ফেরা সব কিছু ধর্মীয় কায়দা কানুনে  দীক্ষা দেয়ার চেষ্টা করছেন। আর দোজখের  আগুনের যে বর্ণনা শুনেছি । ভয় তো পাওয়ারই কথা।
যা-ই হোক পরে শুনলাম যে ছেলে স্কুলের বাইরে হাসিস বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পড়ে, ফলে  তাকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।আর তাই ছেলেকে ভালো করার এক মাত্র মহা ঔষধ হিসাবে ধর্মীয় স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বাসায় প্রতিদিন নামাজের জন্য প্রচন্ড ফোর্স করা থেকে শুরু করে ওয়াজ নসিহত প্রায় অত্যাচারের পর্যায়ে চলে গেছে। ছেলে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অথচ এই বাচ্চাটির প্রফেশনালদের দ্বারা যথাযথ কাউন্সিলিং দরকার ছিল । সেই সঙ্গে তাদের কাছ থেকে মা বাবা-মার  উচিত ছিল পরামর্শ  উপদেশ নেয়া এবং সেই মতো চলা। তা না করে আত্মীয় স্বজন এবং লোক লজ্জ্বার ভয়ে  প্রফেশনালদের ইনভলব না করে এক মাত্র আল্লাহই ভরসা এই ভাবনায় ছেলেকে ধর্মীয় স্কুলে ভর্তি করেছেন।  আর উপরি পাওনা হিসাবে লোকজনদের বাহবা কুড়িয়েছেন।

অথচ বাচ্চাটির জন্য প্রয়োজন ছিল  প্রফেশনাল হেল্প এবং সেই সঙ্গে পরিবারের মধ্যে  ভালোবাসা , আস্থা এবং বন্ধুত্ব পূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করা ।আর দরকার ছিল পরিবারের সঙ্গে মাঝে মাঝে তার বাইরে যাওয়া ।বাইরে যাওয়া মানে শুধু আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া নয়। এমন জায়গায়  যাওয়া দরকার যেখানে গেলে সে আনন্দ পাবে ।আনন্দের বৈচিত্রতা খুঁজে পাবে। চিন্তার প্রসার ঘটবে।  এর মধ্যেই হয়তো সে মনের ভিতর ভালো লাগার আনন্দের অন্য রকম  এক উৎস  খুঁজে পাবে । ফলে তার বোরিংনেস হয়তো কাটবে এবং একটা সুন্দর পথ চলার ট্র্যাকে আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। কিন্তু আমাদের মা বাবাদের অনেক  সমস্যার মধ্যে বড় সমস্যা হলো , যেহেতু আমরা বাবা-মা আমরাই বেশি বুঝি। বাচ্চারা কি বুঝে। তারপর আরেক সমস্যা হলো, এই যে বাচ্চা জন্ম দিলাম যদি সম্পূর্ণ ধর্মীয় শিক্ষা দীক্ষায় দীক্ষিত করে না যেতে পাড়ি তবে পরকালে গিয়ে কি জবাব দিব। তো পরকালের এই জবাবদিহিতার জন্য তৈরি হতে গিয়ে  বাচ্চা যে একটা মানুষ , তার যে মনে ইচছা অনিচছা, পছন্দ অপছন্দ , ভালো লাগা মন্দ লাগা বোধ গুলো আছে সেটা ভুলে যাই।আর ধর্মীয় শিক্ষা বা ধর্মীয় আদেশ নির্দেশ যদি ছোটবেলা থেকে আমরা ঘর থেকে পাই তারপর কি আর কিছুর প্রয়োজন পড়ে?মা-বাবা সন্তানকে যে ধর্মীয় শিক্ষা দিবে সেটা আর কেউই দিতে পারবে না। ছোটবেলা থেকে যে সন্তান ঘরে এই শিক্ষা পাবে সেই সন্তান খারাপ কিছু করতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।আর নতুন করে তাকে ধর্ম শেখানোরও প্রয়েজন পরে না।ছোটবেলা থেকে যে ধর্ম-কর্ম কিছুই করলো না কিন্তু হঠাৎ তার উপর এগুলো চাপিয়ে দিলে সে তো বেপরোয়া হবেই। কারণ তখন আর তার কাছে এটা ভালো লাগবে না।আর হালে জঙ্গী উত্থানের ফলে যা ঘটছে সে বিষয়েও মা-বাবাদের সচেতন হওয়া উচিত।ধর্মীয় শিক্ষার জন্য সন্তানকে কোথায় দিচ্ছেন সেটাও খেয়াল রাখা জরুরী। আর মনে রাখতে হবে আমাদের বড়দের মতোই বাচ্চাদের মান সম্মান বোধ আছে। কিন্তু  আমরা সে  সব ধর্তব্যের মধ্যেই ধরি না। বাচ্চা স্কুলের সামনে হাসিস বিক্রি করতে গিয়ে বিতাড়িত হয়। দোষটা কার?আমি তো মনে করি এই ক্ষেত্রে প্রথম দোষী   হলেন এই মা-বাবা। অথচ সেটা বোঝেনই না। ছোট বেলা থেকে হয়তো ভালো খাইয়েছেন পড়িয়েছেন । ভালো বিছানায় ঘুম পাড়িয়েছেন। অর্থাৎ তার শারীরিক বৃদ্ধি, আরাম এবং আয়েশ এর দিকে নজর দিয়েছেন কিন্তু সমান ভাবে যে তার মনের ও সঠিক পরিচর্যার দরকার ছিল সেটা হয় জানেনই না অথবা দরকার বলে মনে করেন নি।কিন্তু এই ঘাটতি যে রয়ে গেল ! তার ফল কি দাঁড়ালো ? মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তার হাসিস বিক্রির দায়ে স্কুল থেকে বিতাড়িত হওয়া এবং পরবর্তিতে তাকে ভালোকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে তার প্রতিদিনের জীবন যাপনের প্রক্রিয়াকে  আরো কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন যেন ছেলে সুপুত্র বনে যায়। এতে  ছেলে  পুরোপুরি শোধরিয়ে  যাবে?  কি মনে করেন?
চারিদিকে যা ঘটেছে কিছুই কি দেখেন না বা শুনছেন না । নাকি আপনার ঘরে ঘটে নাই বলে বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন? নাকি রান্না বান্না, চাকরি , আত্মীয় স্বজন ,ঘরদোর সামলাতে গিয়ে সময় পাচ্ছেন না।? এখন ম্যানচেস্টারে ঘটনা জের হিসাবে, কি নিজের বাচ্চারা মুসলিম বিধায় পথে ঘাটে কোনো বিপদের সম্মুখীন হবে কি না এই আশঙ্কায় ভুগছেন? তার আগে একবার ও কি ভেবে দেখেছেন যে নিষ্পাপ ,সরল ফুলেরমত প্রাণ গুলো ঝরে গেল ,তাদের কি দোষ ছিল? তাদের বাবা-মার কেমন লাগছে?  কি ভেবেছেন। নাকি মনে করেন ওরা বিধর্মী বলে এদের কোনো বোধ শক্তি নেই। মানবতার বিবেচনায় মানুষের প্রতি এদের বোধ , ভালবাসা  , বিবেক এবং মানবিকতা আমাদের চেয়ে  অনেক বেশি আছে বলেই ওদের দেয়া ট্যাক্সের পয়সায় আজ আমি আপনি ,বাচ্চা এবং পরিবার পরিজন এত নিরাপদ আরামের জীবন কাটিয়ে যাচ্ছি। অথচ দেখেন ওদের কি লাভ। যারা নিজ দেশ থেকে প্রাণ বাঁচানোর দায়ে এদেশে এসে আশ্রয় পেয়েছিল তারাই সেই আশ্রয় দাতার পিঠে চুরি মেরেছে। কোনো বাঙালি এই জঘন্য কাজটি করেনি বলে আমাদের স্বস্তি পাওয়ার কিছু নেই। ভবিষতে কি হবে বলে যায় না। এই ঘটনা আরো যে ঘটবেনা তার কি গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে ?তাই এর প্রতিরোধ দরকার। সম্মিলিত প্রচেষ্টায়  এর মোকাবেলা করা অত্যন্ত জরুরি এখন। আমাদের সবাইকে আন্তরিক ভাবে এই প্রচেষ্টার সাথে একাত্ম থেকে এর প্রতিরোধে সহায়তা করা উচিত এই অস্তির সময়ে।

জানেন কি ওই হামলাকারী নিয়মিত নামাজ পড়তো । আমিও নিজে নামাজ পড়ি । তবে তার সঙ্গে আমার চিন্তা ভাবনা এবং বোধের বিরাট ফারাক। শুনেছি হামলাকারীর পরিবারের সদস্যদের ও গ্রেফতার করা হয়েছে এই হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে।মনে রাখবেন বাচ্চার প্রধান পাঠশালা হচ্ছে তার ঘর আর সেই পাঠশালার প্রধান শিক্ষক হচ্ছেন মা-বাবা। তাই প্রথমত নিজে যে কোনও  গোঁড়ামি এবং কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে ধর্মীয় আচার নিয়ম মেনে চলুন এবং  বাচ্চাকে ও  সেই মতো মানুষ করুন । যাতে সে একজন একজন সুস্থ্য, কুসষ্কার মুক্ত ,মানবতাবাদী , সু শিক্ষিত এবং সু নাগরিক হিসেবে  বেড়ে উঠে। তা না হলে কুড়াল এর কোপ টা  একদিন  হয়তো নিজের পায়ে ই পড়বে ।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com