আমার মা ও হারিয়ে যাওয়া দিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শাওনেওয়াজ কাকলী

বিকেলের পড়ন্ত চকচকে রোদে মাকে দেখতাম উল-কাটা হাতে সেলাই করতো, সঙ্গে পাশের বাড়ির প্রতিবেশী খালারাও সুনিপুন সেলাইয়ে বিভোর মুখে পান আর বাংলা সিনেমার গল্পে ।
আমরা ছোটরা পাশেই হইছই করে ছুটোছুটি করে খেলতাম। খেলার ফাঁকেই হঠাৎ ডাক পড়তো, দৌড়ে ছুটে যেতাম। ছোট্ট দুটি হাতের ভেতর উল পেঁচাত আর পুরনো কেনা সুয়েটার থেকে ফুরফুর করে উল খুলে আসতো আমার হাতে।
এই উল খুলে আসা দেখতে যে কী আনন্দ হত! কেন হতো? বলতে পারবনা। দারুন অনুভুতি।প্রতিবেশী খালারা উলগুলো নেড়ে দেখতেন আর প্রশংসা করে বলতেন কি বানাবেন? আনারস,রসগোল্লা,পাতা,উল্টাসোজা, নানান প্যাটানের নাম বলতেন। একটা ডিজাইন নিয়ে যেন একজন আরেকজনকে শিক্ষকের মত শিখিয়ে দিতেন। সব শুনে মনে হতো,আমার জন্য বানানো কোন ডিজাইনের নাম। আমার একটা কার্ডিগান,ফ্রক, হাতমোজা, পা-মোজা,টুপি কিছু একটা, নাহলে আমাকে দিয়ে ধরিয়ে উলগুলো পেঁচালো কেন?
কোঁকড়া কোঁকড়া চুলের মত রঙিন উল। সেখানে কত স্বপ্নমাখা।আর যদি গায়ে ধরে মাপ নিয়ে কিছু বানিয়েছে তো রক্ষা নাই।
বিশেষজ্ঞ মা-খালারা উল ধরেন আবার বলে দিতেন-এটা ৮ নম্বর,৯,১২,১৪ নম্বর কাটা লাগবে। সেসময় একজনের দুই-এক জোড়া কাটা না থাকলে কিচ্ছু যেত আসতো না বরং কাটা আদান-প্রদানের মধ্যদিয়ে শেষ হয়ে যেতো নিপুণ শিল্পকর্ম এবং শীতের প্রয়োজন।
কখনো কাটা আনতে অন্য খালাদের বাসায় পাঠালে, কেমন যেন এক ঠ্যাং লাফিয়ে লাফিয়ে দৌড়ে চলে যেতাম।তখন আমরা খালাদের নাম জানতাম না।চাকুরীজীবি খালাদের সহজে ডাকতে পারতাম কিন্তু বাকী গৃহিণী খালাদের চিনতাম তাদের বড় মেয়ে বা ছেলের নামানুসারে। ঝুনুর মা খালা, নুরন্নাহারের মা খালা,সোমার মা খালা, এনামুলের মা খালা, মুনের মা খালা এভাবে পুরো পাড়ার খালাদের বাসাগুলো মুখস্থ্য ছিল।
আম্মার ড্রয়ার ভরা উলকাটা ছিল। বাঁশের তৈরি কাটা সেখানেও নাম্বার ছিল মায়ের মাথাতে আর চোখে পড়ে,ঠিক উলে ঠিক কাটা প্রয়োগই হতো। কত কাটা যে নষ্ট করেছি,হারিয়ে ফেলেছি। ভাইবোন মারামারি করেছি সেই কাটা দিয়ে আবার শীতের জমানো নারকেল তেল খুছিয়ে বের করে সেখানেই জোড়া নষ্ট করে ফেলে রেখে এসেছি। তখন মারের ভয়ে স্বীকার করেনি।
কাটা আর উলের নাচুনিতে তৈরি হতো সুন্দর সুন্দর শীতের পোশাক।সেই ডিজাইন ছড়িয়ে যেতো পাড়াময় মুখে মুখে।কত বায়না আসতো আম্মার কাছে একটা সোয়েটার বানিয়ে দিতেই হবে। আমার মার অপরিসীম ধৈর্য্য উলকাটা্র পোশাকের দক্ষতায়।যেকোন ডিজাইন কিভাবে গুনে গুনে ঠিক তুলে ফেলতো।

প্রায়ই সন্ধায় হুঙ্কার আসতো, “কেউ যদি পড়া থেকে উঠছে তো পিঠের চামড়া থাকবেনা” বলে নতুন উলের বানানো চাদরখানা গাঁয়ে চেপে প্রতিবেশী খালার বাসা সান্ধ্যকালীন সফরে বের হতো।
হুউউম ! বইয়ের ভেতর মুখ লুকিয়ে ভেংচি কাটতাম।আবার কখনো সাহস নিয়ে বলে ফেলতাম, আমি যাবো। যেদিন কপাল ভাল বলতো, “৫মিনিটের মধ্যে আসতে পারলে আসো” খুশিতে বলি “ একমিনিটেই আসতে পারবো।
খালাদের বাড়িতে গাঁয়ের চাদরটা নিয়ে চলে জল্পনাকল্পনা।আমি ওতো বুঝিনা। আমি বুঝি ওই বাড়ীর সবচেয়ে ছোট্ট মেয়েটা বা মিষ্টিভাষা শৈল্পিক মানুষাটা কে?
পাকঘরে যাই, মাটির উনুনে কড়াইতে গরম তেলে চিড়ে পড়ে। চিঁড়েগুলো পুরপুর করে ভাজা হয়। পেয়াজ কাঁচামরিচ দিয়ে মেখে-দুধ চা দিয়ে পরিবেশন করা হতো। তবে আমি ঝাল কোনদিন খেতে পারতাম না, মিষ্টি চিড়া হলে আমার আপত্তি একেবারেই ছিলনা।বিশেষ আয়োজনে ছোট্টদের জন্য ঘি আর চিনি মাখা চিড়াও ছিল।
আরেকদিন চিড়া থেকে আরেকটা গল্প বলবো।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com