আমার বেলা যে যায়…

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেখ রানা (নিউবুরি পার্ক, লন্ডন)

এক.

অদ্ভুত এক ভাসমান জীবন যাপন করছি।

এডিনবরা ছেড়ে লন্ডন এলাম তাও মাসখানেক হয়ে এলো। নর্থ গ্রীনিচ এর ক্ষণকালীন আবাস ছেড়ে আমরা উঠে এলাম নিউবুরি পার্কে। বিটন ভাই-পৃথা আপুর বাসায়। এই চমৎকার দম্পত্তির সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক পুরানো। লন্ডনে প্রথম প্রবাস জীবনে দেখাসাক্ষাৎ আর বন্ধুত্ব। ক্রমে ক্রমে আমার সহধর্মীণি মিশুর সঙ্গেও সখ্য।

দুজনেই দারুণ আড্ডাবাজ আর গান প্রেমিক মানুষ। বেশ ভাল সময় কাটছে আমাদের। এর ভেতর বহু আকাঙ্ক্ষিত ‘এক চিলতে বাসা’-ও পেয়ে গেছি। কাঠখড় পুড়িয়ে বলতে পারছি না তবে বিস্তর ঝামেলা যে হয়েছে সে তো বলাই বাহুল্য। লন্ডন যে এত ব্যয়বহুল শহর হয়ে গেছে কল্পনাও করিনি। এক রুমের ফ্ল্যাট পেতে বিশাল অঙ্কের টাকা গুনতে হয় তাঁর সঙ্গে গ্যাস, পানি আর কাউন্সিল ট্যাক্স মিলেমিশে বিশাল ফর্দ। ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা! তাও, ভালো কাগজে কলমে একটা স্থায়ী নিবাস হলো।

লন্ডন অনেক বদলে গেছে! নাকি এই সময়টাতে আমারই অদল-বদল হয়ে গেছে টের পাই না।

আমার তবু চুপচাপ পার্কের বেঞ্চিতে অথবা খুব কোলাহল-কে জানালার ও পাশে রেখে কোনো ক্যাফেতে বসে শব্দ সাজাতে ইচ্ছে করে। কাগজে-কলমে। কাঁটাছেড়া করে। ল্যাপটপের স্ক্রিণে না।

এর কিছুই হচ্ছে না যদিও। বস্তুগত জটিলতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছি এদিক-ওদিক।

ক্লান্তিকর জীবন, গীতিকারের গল্প এখন!

দুই.

সেই লাল রঙা বাস আর  দ্রুত গতিতে ধাবমান ভূ গর্ভস্থ ট্রেন।

লন্ডন হলো চিরকুট এর সেই জাদুর শহর গান এর সার্থক মডেল। লক্ষ লক্ষ মানুষ, গাড়ি আর ব্যস্ততাকে সুনিপূন সুতোয় বেথে ফেলেছে। আলাদা করে বলতেই হয় আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেন এর সুব্যবস্থার কথা। জুবলি লাইন, ডিস্ট্রিক্ট লাইন, নর্দান লাইন-এ রকম হরেক লাইন এর নাম ধরে এক এক ট্রেন এক এক দিকে ছুটে চলে। মিনিট পরে পরেই ট্রেন হাজির। পিক টাইম আর অফ পিক টাইম বলে একটা সময় নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে। ভাড়া কম বেশী করে যাতায়াত এর সুব্যবস্থা আছে। পিল পিল করে মানুষ ছুটে যাচ্ছে শহর এর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। স্ট্রাটফোর্ড থেকে বার্কিং, প্লেসটো ধরে ভিক্টোরিয়া অথবা হোয়াইটচ্যাপেল থেকে আপমিনিস্টার।

আমার হাতে এখন কাজ নেই তেমন। মাঝে মাঝেই হোয়াইটচ্যাপেল এর মূল সড়ক ধরে ফুটপাথে নেমে আসি। ব্যস্ত মানুষজন দেখতে ভালো লাগে, অবসর ধরে রেখে।

তিন.

আমি চাই, আমার শব্দচয়ন মানুষের মনে আশার আলো দিক, সুন্দর অনুভূতির যোগান দিক।

লেখালেখির শুরুতে এ রকম করে ভাবিনি। সেই প্রজ্ঞা ছিলো না আমার। তখন যে কোনো ভাবে হোক লিখে পরিচিতি পেতে চেয়েছি। একটা শক্ত জমিন চেয়েছি যাতে  বেশী লিরিক লিখতে পারি। অনেক শিল্পীর সঙ্গে কাজ করতে পারি। সেই ভাবনার বাঁকগুলো, বলাই বাহুল্য বদলে গেছে।

লেখালেখির এই পর্যায়ে এসে আমি এক ধরনের নিমীলিত শান্তি অনুভব করি।  এখন আর অনেক লেখার তাড়া নেই, লেখা শুরু করার কিছু দিন পরেই আসলে আমি অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম  মিডিয়া থেকে, এক প্রকার নির্বাসনে-দেশ থেকে দেশান্তরে। এখন মনে হয়, এই নির্বাসন, এই  দূরে চলে যাওয়া বরং আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। একদম নির্লিপ্ত হয়ে লেখার রসদ দিয়েছে। আমার লেখাগুলোও এই আদলেই বেড়ে উঠেছে, গান হয়েছে, হবে।

ইদানিং গান শোনা কম হয় আমার। ঘুরে-ফিরে সেই পুরানো গানেই ফিরে যাই। ডাউন মেমোরি লেন ধরে হাটতেই আরাম বোধ করি। হঠাৎ বর্তমানে ফিরে এসে নতুন গীতিকারদের লেখা পড়ে চমকিত হয়, আনন্দ পাই। বাংলা গানে গান লেখার ইতিহাসের খুব অদল বদল হয় নি কিন্তু। ৮০-৯০ এর সময় ধরে রেখেই ব্যান্ড এর গান, বা সমসাময়িক গান এগিয়ে চলেছে।

আমিও সেই পথ চলার একজন পথিক। এই ভাবনাটা আমাকে শীতকালের খদ্দরের চাদর হয়ে জড়িয়ে রাখে। ওম দেয়।

ভালো লাগে আমার তখন।

চার.

ঢাকা টানছে আমাকে প্রবল ভাবে।

এলোমেলো ঘুরে বেড়ানো, এক-আধদিন বাপ্পা ভাই এর স্টুডিও তে আড্ডা দেয়া, সেই নীলা মেটার্নিটির গলি, হাইকোর্ট কম্পাউন্ডে গিয়ে বসে থাকে চুপচাপ। অথবা রিকশা নিয়ে চলে যাওয়া পুরানো ঢাকা…এ গলি থেকে ও গলি।

বইমেলাকে সামনে রেখে দুটো বই প্রকাশের কথা চলছে। পাণ্ডুলিপি জমা দিয়েছি প্রকাশককে। একটি টুকরো নাগরিক জার্নাল। টুকরো ভাবনার জার্নাল। ২০১২ থেকে লেখা শুরু করেছিলাম মনে আছে। আর একটা বই হলো- গীতিকবিতার বই।

এই দুটো বই এর গন্ধ নিতে চাই আকুল হয়ে, পাঠক এর হাতে বই দুটো দেখতে চাই। দু’দন্ড বসতে চাই প্রকাশনার স্টলে। চমচমে রোদ মাথায় নিয়ে চা আর সিঙ্গাড়ায় আড্ডা দিতে চাই পাঠকের সঙ্গে, কবিদের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে।

দেশে ফিরতে চাই আমি। অনেক লেখা নিয়ে, অনেক গান নিয়ে।

স্বপ্ন নিয়ে অপার।

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com