আমার পাতাবাহার সময়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুখসানা আকতার

( লন্ডন থেকে): আজকাল মন উড়াল দেয় । আমি শাসন করি , বলি বয়স হয়েছে একটু স্থিত হও বাচা। সে কি আর শুনে। বাসের ,ট্রেনে ,কাজে ,ট্রেনিং এ বা গৃহস্থালির কাজের মধ্যে ,সে স্মৃতির মেঘদলে ভর করে এদিক সেদিক ইচ্ছে মতন উড়ে বেড়ায় ।এদিকে আমার যে তরকারি পুড়ে ,স্টেশন মিস করি ,পরবর্তী বাস স্টপে নামতে ভুলে যাই, তার কোনো খেয়ালই নাই। আসলে কেন এমন হয় ? স্মৃতিরা এতো পিছু ডাকে কেন ?  এটা কি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাকি দীর্ঘদিন স্বদেশ , আত্মীয় স্বজন , আত্মার আত্মীয় বন্ধু বান্ধব এর সঙ্গে  বিচ্ছিন্নতার কারণ? তবে এই স্মৃতি গুলো  বুকের ভেতর মট মট করে শুকনো ডাল ভাঙার আওয়াজ তুলে নিঃস্তব্ধতা পূর্ণ করে আমাকে সচল রাখে । আমি জেগে উঠি , জীবন কে অনুভব করি। মনে মনে বলি এতো পরিবর্তন ,ভাঙা গড়ার পর ও জীবন তুমি যেন বাড়ির আঙিনায়  বাবার হাতে লাগানো অনেক রঙের ফোটায় সাজানো বৃষ্টি স্নাত সেই পাতা বাহারের প্রিয় গাছটি আমার।

আজকাল কেউ রেডিও শুনেন কিনা জানিনা । ছোট বেলায় এই রেডিও ছিল দৈনিন্দন  গৃহস্থালী জীবনের বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম। আর ছিল সিনেমা হলে গিয়ে বাংলা সিনেমা দেখা। দুপুরের সেই বিজ্ঞাপন তরঙ্গ  অনুরোধের আসরে  যখন রুনা লায়লার ” অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে ”  জানালা দিয়ে ভেসে আসতো ,তখন বাড়ির আঙিনায় স্নান শেষে ভেজা চুলে ,ধোয়া কাপড় শুকাতে দিতে দিতে কোনো এক ষোড়শী আনমনা হয়ে যেত। আর তার মন তখন বাড়ির লাগোয়া বাগিচার সেই মেঠো পথে কারো পদধ্বনি শুনার জন্য মন উন্মুখ হয়ে উঠতো। সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায় সৈনিক ভাইদের জন্য আয়োজিত অনুরোধের আসর দুর্বারে ভাই বোন সবাই মিলে  গোল হয়ে বসে সিনেমার গান শুনতাম । খুবই জনপ্রিয় ছিল এই অনুষ্ঠান গুলো।রবিবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন । এই দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল দুপুর বেলা রেডিওতে সাপ্তাহিক নাটক শোনা।সেদিন তাড়াতাড়ি সব কাজ শেষ করে দুপুরে খেয়েদেয়ে বিছানার উপর রেডিও রেখে আয়েশ করে শুয়ে বসে নিঃশব্দ পরিবেশে  সবাই মিলে নাটক শুনতাম। নাটকের কথপোখথন , মিউজিক ,এমনকি শব্দ গুলো চোখ বন্ধ করে এমন  তন্ময় হয়ে শুনতাম যে সঙ্গে সঙ্গে  কল্পনায় সেই পুরো নাটক যেন চোখের সামনে চলে আসতো।যখন বাড়িতে বড়ভাই প্রথম ক্যাসেট প্লেয়ার নিয়ে আসেন। তখন মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ,কর্তা শচীনদেব বর্মন, আশা, লতা ,সন্ধ্যা ,প্রতিমা সহ আরো অনেক গুণী শিল্পীদের গান শুনি যা আগে একমাত্র পুজোর সময় মাইকে বাজানো হতো। হেমন্তের সেই জন প্রিয় গান “ও নদী রে একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে” মন সঙ্গে সঙ্গে খোয়াই নদীর পাড় ধরে ছুটতে শুরু করতো। আবার ভূপেন হাজারিকার “রানার” গানটি শুনার সঙ্গে সঙ্গে চোখে ভাসতো ডাক পিয়নের ঝড় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে অবিরাম ছুটে চলা।  তারপর বাসায় প্রতিদিন ইত্তেফাক পত্রিকা আসতো। সেই সঙ্গে আসতো সাপ্তাহিক বিচিত্রা, আবার বড় বোনদের জন্য চিত্রালী , পূর্বানী রাখা হতো। সেগুলোও পড়ার জন্য হড়োহুড়ি লেগে যেতে। সবার ছোট ছিলাম বলে সবার শেষে পড়ার সুযোগ হতো। কিন্তু কখন পড়ার সুযোগ পাবো সে উত্তেজনায় মন ছটফট করতো ।সেই সময়ে রেডিও শোনা , সিনেমা দেখতে যাওয়া , গল্পের বই , বিচিত্রা , চিত্রালী ,পূর্বানী পড়া এই গুলোই ছিল  মানুষের প্রাত্যাহিক জীবনের  আনন্দের ,ভেন্টিলেশনের এক অবিচছেদ্দ অংশ। সুস্থ বিনোদন।

লেখকের মা ও অন্যান্য আত্মিয়

গল্পের বইয়ের নেশা ছোট বেলা থেকেই হয়ে গিয়েছিলো।মীর মোশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু, বেদুইন সামাদের বেলাশেষে সহ শরৎচন্দ্র ,বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ,কাজী নজরুল,বিভূতিভূষণ ,গজেন্দ্র কুমার মিত্র তার পর নিমাই, নীহারঞ্জন , আশুতোষ এর উপন্যাসগুলো  বই পড়ার নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলো। এখনো মনে পড়ে সবে ক্লাস ফোরে পড়ি। ঠাকুরমার ঝুলি শেষ করে বাসার আলমারিতে রাখা দস্যু বনহুর আর কুয়াশা সবে পড়া শুরু করেছি। দস্যু বনহুর এমনি নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলো যে একটা বই শেষ করে পরবর্তী সিরিজের বই না পড়া পর্যন্ত ছটফট করতাম। এভাবে পড়তে পড়তে এই সিরিজের একশত বই পড়া হয়ে গিয়েছিলো ।মনে আছে সেটা ছিল রোজার ঈদ ।আগেই ঘোষণা দেয়া হয়েছিল যে দস্যু বনহুরের ছেলে, দস্যু জাবেদ নাম নিয়ে 101 নম্বর বইখানিতে তার অভিষেক ঘটতে যাচ্ছে। ততদিনে আমার গল্পের বই পড়ার সাগরেদ যে আমার চেয়ে এক ক্লাস নীচে পড়তো ,রীতা জুটে গিয়েছিলো । অনেক কষ্ট করে সাড়ে চার টাকা জমিয়ে আনন্দ আর ধরে না যে বইটা পড়া হবে নিশ্চিত। নতুন ঈদের জামা আর নতুন বই দস্যু জাবেদ পড়ার চিন্তা করে দুজনেই যারপর নাই পুলকিত রোমাঞ্চিত তখন। বই কিনে  ছাদের চিলে কোটায় দুপুরের খাওয়া নাওয়া ভুলে এক সঙ্গে বসে এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলি দুজনে। আমার আবার তখন একই বই কয়েক বার না পড়লে হতো না । তাই ফ্রকের নীচে হাফপ্যান্ট এর ভেতর গুঁজে বাসায় এনে কাপড় রাখার আলনার নীচে লুকিয়ে রাখি। দুদিন পর যখন সন্ধ্যায় পাঠ্য বইয়ের ভিতর দস্যু জাবেদ বই খানি রেখে পড়া শুরু করি তখন আমার মেডিক্যাল পড়ুয়া সেজ ভাইয়ের হাতে পাকড়াও হয়ে চরম শাস্তিতে দণ্ডিত হই। বলা হলো যে ,এই বই আমার নিজের হাতে ছিঁড়ে লাকড়ির চুলায় পুড়াতে হবে। আমি হাপুস নয়নে কাঁদছি , বই ছিঁড়ছি আর লাকড়ির চুলার জ্বলন্ত অগ্নি কুন্ডে নিক্ষেপ করছি,হৃদয় আমার চৌচির হয়ে যাচ্ছে, এ যেন প্রেমিককে আপন হাতে চিতায় পুড়াচ্ছি। বাসার সবার ছোট ছিলাম। আশা ছিল কেউ হয়ত সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে কাছে আসবেন। না ,বড় ভাই বোনেরা  আমার অবস্থা দেখে হেসে কুটিপুটি হচ্ছিলেন। ওদের পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্টুর মানুষ মনে হচ্ছিলো তখন। তারপর ও আমার নেশা কমেনি। বানর একবার গাছ বাইতে শিখে গেলে কি আর ভুলে। তো পুরো উদ্দমে আমার দস্যু বনহুর , দস্যু বাহরাম আর কুয়াশা পড়া চলতে লাগলো। কৈশোরে এসে মাসুদ রানা পড়ার নেশা চাপে । এক খন্ডে অথবা দুই খন্ডে এক গল্প শেষ। স্টার প্লাসের সিরিজের  বা বনহুরের বইয়ের মতো হঠাৎ করে শেষ হয়ে পরবর্তী সিরিজের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। তার উপর মাসুদ রানার বইয়ে এডাল্ট ব্যাপার স্যাপার আছে ।  বাড়তি আকর্ষণ তাই বেড়ে গেলো। সেবা প্রকাশনীর বই পড়ে পড়েই  মফস্বলের সেই কৈশোর মেয়েটির টেক্সাসের কাউবয়দের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে এবং তাদের প্রেমে পড়ে।

আজ এই মধুর স্মৃতি গুলো আমার বর্তমানের সময় গুলোকে সজীব রাখে , প্রাণ দান করে, বাঁচার প্রেরণা জাগায়।নাহলে মাঝখানের যে চব্বিশ টা বছর আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম কোনো এক ব্ল্যাকহোলের আবর্তে , সেখান থেকে টেনে বের করে বাঁচিয়ে আবার আগের আমিকে ফিরিয়ে দিয়েছে আমার সেই রোদেলা ,সুফলা, সবুজ ,সহজ সরল বাল্য কাল, কৈশোর আর তরুণী বেলার  দিনের সেই স্মৃতি গুলো। আমি এখনো অন্যান্য গানের পাশাপাশি  ইউটিউব এ আগের বাংলা গান গুলো শুনি।হয়তো  সব গানের লিরিকস গুলো ঐমানের ছিল না কিন্তু তারপর গানের সুর ,কথা , শিল্পীর কন্ঠ সব মিলিয়ে আমাকে আমার সেই সোনালী অতীতে উড়িয়ে নিয়ে যায় । আমি চোখ বন্ধ করে সেই রং , গন্ধ ,সেই মানুষ ,খোয়াইনদী  ইনতাবাজ গ্রাম, স্টাফ কোয়াটারের পুকুর , ঝম ঝম বৃষ্টির মাঝে ঘুরে বেড়াই । যা আমার একান্ত নিজস্ব। কেউ শত চেষ্টার পরও ছিনিয়ে নিতে পারেনি। আমি সযত্নে লুকিয়ে রেখেছিলাম দুই যুগ আমার হৃদয়ে এক আবদ্ধ পিঞ্জরে। এখন আমি স্বেচ্ছা মুক্তি প্রাপ্ত এক স্বাধীন মানুষ। তাই আমার স্মৃতি গুলো ,স্বপ্নগুলো মুক্ত নির্মল নীলাকাশে যখন তখন লাল ঘুড়িতে বেঁধে উড়িয়ে দেই।সেই সঙ্গে চোখ বন্ধ করে আমি ও উড়ি । মধুময় স্মৃতি  তুমি  অসুন্দর আর সুন্দরের  মাঝ সে এক সেতু বন্দন। তুমি আছো বলেই জীবন আমার যেন এক সাত রঙে পাতাবাহার।

ছবি: সৌজন্যে লেখক ও গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com