আমার না হয় আবুল হাসান-ই থাক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুদ্রাক্ষ রহমান

দেখা যাক, শোনা যাক এবং বোঝার চেষ্টা করা যাক, একজন কবি কী বলছেন- ‘শিল্পতো  নিরাশ্রয় করে না। কাউকে দুঃখ দেয় না’। কবি আরো বলছেন,
শিল্পতো স্বাতীর বুকে মানবিক হৃদপিন্ড-, তাই
আমি তার হৃদপিন্ডে যাই, চিরকাল রক্তে আমি
শান্তি আর শিল্পের মানুষ।’
এই উচ্চারণ গুলো কবি আবুল হাসানের। এই ভূখন্ডের এক একা, নিঃসঙ্গ মানুষ, কবি। তিনি কেবল প্রেম আর শিল্পের কথাই বলেছেন কবিতায়। তাই, তার উচ্চারিত প্রতিটি কথাই হয়ে গেছে এক একটা  কবিতা।
একজন মানুষ। এই শহরে এলেন। নিজের কথাটা বলতে চাইলেন একদম নিজস্ব ভঙ্গীমায়। তিনি বললেন এবং খুব, খুব ছোট্ট একটা জীবনযাপন করে তিনি চলেও গেলেন। সত্যি কি চলে গেছেন আবুল হাসান? আবুল হাসানরা কি যান কোথাও; তাদের কি প্রস্থান আছে?
আবুল হাসানের প্রথম কবিতার বই- ‘রাজা যায় রাজা আসে’। প্রথম প্রকাশ ডিসেম্বর ১৯৭২। বইয়ের উৎসর্গ পাতায় তিনি লিখলেন, ‘আমার মা আমার মাতৃভূমির মতোই অসহায়।’ আর এই বইয়ের প্রথম কবিতার নাম ‘আবুল হাসান’। কবিতায় প্রথম উচ্চারণ
‘সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র
মায়াবী করুণ
তারপরের কাব্যের  নাম ‘যে তুমি হরণ করো’। প্রথম প্রকাশ ১৯৭৪। এর উৎসর্গপত্রে হাসান লিখে দিলেন, ‘আমরাই তো একমাত্র কবি/ আমার উদ্বাস্তু-উম্মুল যৌবন সঙ্গী নির্মলেন্দু গুণ-কে।’
আবুল হাসানের তৃতীয় এবং তার জীবনকালে শেষ কাব্যগ্রন্থ-‘পৃথক পালঙ্ক’। প্রথম প্রকাশ ১৯৭৫। উৎসর্গ সুরাইয়া খানম। এই সুরাইয়া খানম, তিনিও কবি এবং তিনি কবি আবুল হাসানের জীবনে পৃথক এক উজ্জ্বল পালঙ্ক।
আবুল হাসান নেই, মাত্র তিনটি কবিতার বই দিয়ে চলে গেলেন তিনি। তার যাবার পর অগ্রন্থিত কিছু কবিতা জোড়া দিয়ে তিন কাব্য গ্রন্থের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে ‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র।’ এর বাইরে তার গদ্যের একটি বই প্রকাশিত হয়েছে।
আবুল হাসান সম্পর্কে আরেক উজ্জ্বল কবি শামসুর রাহমানের উচ্চারণ-‘ তিনি যৌবনের, বিষন্নতার, নৈসঃঙ্গ এবং দীর্ঘশ্বাসের কবি। তাঁর শিল্প-সৌন্দর্য বোধ যেমন তীক্ষ্ম তেমনি তীব্র মানুষের প্রতি তাঁর মমতা, জীবনের প্রতি ভালোবাস।’
১. ‘পৃথিবীর তিনভাগ জলের সমান কারো কান্নাভেজা চোখ?’
২.‘অবশেষে আমি জেনেছি মানুষ একা
জেনিছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা।’
৩.‘সেখানেও বসে আছে বৃক্ষের মতোন একা একজন লোক।’
৪. ‘জিভ দিয়ে জিভ ছোঁয়া চুমোর গন্ধ থাকুক এই কবিতায়।’
৫.‘হৃদয় একটাই, কিন্তু সব দিকে ওর গতায়াত,
বড় গতিপ্রিয় হয় এই বস্তু, বড় স্পর্শকাতর।’
৬. মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবে না।’
৭. ‘আমি জানি না দুঃখের কী মাতৃভাষা
ভালোবাসার কী মাতৃভাষা
বেদনার কী মাতৃভাষা
যুদ্ধের কী মাতৃভাষা
আমি জানি না নদীর কী মাতৃভাষা
নগ্নতার কী মাতৃভাষা
একটা নিবিড় বৃক্ষ কোন ভাষায় কথা বলে এখনো জানি না।’
৮. ‘লক্ষ্মী বউটিকে
আমি আজ আর কোথাও দেখিনা
হাটি হাটি শিশুটিকে
কোথাও দেখিনা;
কতগুলি রাজহাঁস দেখি,
কতগুলি মুখস্ত মানুষ দেখি, বউটিকে কোথাও দেখি না
শিশুটিকে কোথাও দেখি না!
৯.‘বৃষ্টি হলে গা জুড়োবে, কেউ কেন বলে না এখন।’
১০. ‘একটা কিছু মারাত্মক ঘটছে কোথাও
নইলে মানুষের দরোজায় টোকা দিলে কেন আজ দরোজা খোলে না।’
এভাবে শত শত কবিতার লাইন আবুল হাসানের পাঠককে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
কবিতাহীন, প্রেমহীন, ভালোবাসাহীন প্রতিযোগিতার এই শহর। এই ঢাকা শহরে একদা প্রেমছিলো, কবিতা ছিলো। তখন মানুষের দরোজায় টোকা দিলে সত্যি সত্যি দরজা খুলে যেতো। কবিতার উপমার মতো  মানবী এসে দাঁড়াতেন কবির সামনে। আবুল হাসান সেই কবিতা, সেই সৌন্দর্য ছুঁয়েছিলেন। তাইতো তার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি কবিতা এমন লাবণ্যময়, এমন তীব্র প্রেমময়, এমন মূলধরে টান দেয়া মানুষ।
আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে, এই শহরে হয়তো অনেকের অনেক কিছু আছে। কারো কারো তুমুল নিঃসঙ্গতা আছে। বেদনার হিমালয় আছে কারো কারো বুকে। কারো কারো চৈত্রের দুপুরে মিষ্টিলাজুক প্রেমিকা আছে পাশে। কারো আছে সাত আসমান হাকাহার! অনেকের অনেক কিছুই হয়তো আছে! আর আমার, ভরদুপুরে, মধ্যরাতে, শুরু হওয়া দিনের মাথায়, আবুল হাসান পড়তে পড়তে মনে হয়, আর কিছু নয়, আমার না হয় আবুল হাসান-ই থাক!

লেখকঃ গল্পকার

ছবি : গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com