আমার দেখা নায়করাজ…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আবিদা নাসরীন কলি: সময়টা ছিলো ১৯৯৫ সাল। ডিসেম্বর মাস। সাক্ষাতের সময় আগেই নির্ধারণ করা ছিলো। নির্দিষ্ট দিন  বেলা ১০টায় পৌছে গেলাম লক্ষীকুঞ্জের গেটে।ভেতরে ঢুকেই দেখি তিনি দাঁড়িয়ে।পরনে ফর্মাল শার্ট-প্যান্ট, আর শীত বলে শার্টের উপর শর্টস্লিভ সোয়েটার।দেখা মাত্রই স্বভাবসুলভ হেসে বললেন, তোমার অপেক্ষাতেই আছি।বাসা চিনতে সমস্যা হয়নিতো?আমি বললাম, ঠিকানা এমন ভাবে বলে দিয়েছেন যে, যে কেউ শুনলেই চলে আসতে পারবে।

মানুষটির নাম রাজ্জাক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা। সেই প্রথম তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে মুখোমুখি হওয়া। তখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্সি গা থেকে খসে পড়েনি।১৯৯০ সাল থেকেই বিনোদন সাংবাদিকতার সঙ্গে আমার পরিচয়। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকেই চলে সাংবাদিকতা।দীর্ঘদিন বিভিন্ন পত্রিকায় প্রদায়ক হিসেবে কাজ করেছি।তারপর, ১৯৯৫ সাল। সাপ্তাহিক পূর্ণিমা ম্যাগাজিনের বিনোদন বিভাগে ষ্টাফ রিপোর্টার হিসেবে নিয়োগ পাই।সেবছরই ডিসেম্বরে প্রয়াত সাংবাদিক রবি আরমান  আমাকে নায়ক রাজ রাজ্জাককে নিয়ে একটা কাভার ষ্টোরি করার অ্যাসাইনসেন্ট দেন।বলেন, পুরো বায়োগ্রাফিই যেন উঠে আসে।আরও বলেন,৯৬-এর প্রথম সংখ্যাটাই বের হবে রাজ্জাক ভাইকে নিয়ে।আমিও বলা মাত্রই রাজী।তখনও মোবাইলের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ ঘটেনি।সংযোগের একমাত্র মাধ্যম ল্যান্ডফোন।ফোন করলাম কথা হলো রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে, একদিন তাঁর বাসায় দিনভর আড্ডা হবে।আগে কখনও তাঁর বাসায় যাইনি বলে ঠিকানাটা বিশদভাবে বুঝিয়ে দিলেন।

রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে গেট থেকে বাড়িরদিকে আগাতেই দেখি একটু দূরে বারান্দায় ভাবী দাঁড়িয়ে।বেশ অনেক বড় জায়গা নিয়ে তার বাড়িটি।চারিদিকে গাছ-পালা দিয়ে সাজানো।শুনেছি একসময় সিনেমায় বড়লোকের বাড়ি দেখাতে হলে এই বাড়ির লুকটা ব্যবহার করা হতো।কখনও বাড়িটিও হয়তো ব্যবহার করা হয়েছে।

ড্রইংরুমে বসেই কথা হচ্ছিলো।রাজ্জাক ভাই ভাবীকে ডেকে তার পাশটিতে বসালেন।শুরু হলো কলকাতা থেকে বাংলাদেশে তার জার্নি দিয়েই।ঢাকায় এসে কি নিদারুন সময় কেটেছে সবই বলে গেলেন অকপটে।কতদিন না খেয়ে হেটে হেটে ঢাকা শহরে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে কিছু একটা করার জন্য।ভাবীর বিষয়ে কোন কথা জানতে চাইলে বার বার ভাবীর দিকে তাকাচ্ছিলেন আর দুজনেই মৃদু  মৃদু হাসছিলেন।আবার কখনও বলছিলেন এগুলো তোমার ভাবীর কাছ থেকেই জেনে নাও।দুজনের ভেতরকার ভালোবাসা আর বোঝাপড়াটা সেদিন আমি পড়তে পেরেছিলাম।এরই মধ্যে ছোট ছেলে সম্রাটকে ডেকে পরিচয় করিয়ে দিলেন।সম্রাট তখন স্কুল পড়ুয়া কিশোর। ওকে অভিনয়ে আনবেন কিনা জানতে চাইলে বলেন,সে ওর ইচ্ছে।ছেলে-মেয়ের প্রসঙ্গ উঠতে ভাবী বড় মেয়ের সম্পর্কে অনেক কথা বললেন। কারণ তখনও বড় মেয়ের মৃত্যুশোক তারা কাটিয়ে উঠতে পারেননি।সেদিন অন্য দুই ছেলে  বাসায় ছিলো না।

আমাদের কথার মাঝখানে রাজ্জাক ভাই বারবার এয়ারগান হাতে লনে চলে যাচ্ছিলেন।কি করছিলেন বুঝে উঠতে পারছিলাম না।তাই ভাবীর কাছে জানতে চাইলাম, ভাই কি করছেন?ভাবী হেসে বললেন, গাছ থেকে নিশানা করে ডাব পাড়ছেন।কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই ডাবের পানি চলে এলো।সঙ্গে নানান রকম নাস্তা।এরই মধ্যে একবার রাজ্জাক ভাই রুমে ঢুকে বললেন, ‘ঘর-সংসারের কথা ওর কাছ থেকেই জেনে নাও।’ আমি আর ভাবী কথা বলছিলাম আর উনি রুমের চারপাশের বারান্দায় ঘুরে ঘুরে যেন আমাদের কথাই  শুনছিলেন।এভাবেই ঢাকা আসা থেকে শুরু করে সেদিন পর্য্ন্ত নায়করাজের জার্নিটা শেষ করলেন।এবার ছবি চাইলে ভাবী অনেকগুলো অ্যালবাম নিয়ে আসেন।আবার রাজ্জাক ভাই রুমে ঢুকে বসলেন। আমি বেছে বেছে ছবি নিলাম, তবে কথা দিলাম ছবিগুলো ফেরত দেবো কাজের শেষে। সবশেষে তার কাছে জানতে চাইলাম, রাজলক্ষী প্রোডাকশনের লোগোটার কথা।স্ট্রিট লাইটের নিচে বসা এক নিঃসঙ্গ মানুষ,  এটার মানে কি? তিনি বললেন, লোকটা তো আমি।এভাবেই খালি হাত-পায়ে এ শহরে আমার আগমন হয়েছিলো।কথাটা শুনে সেদিন খুব ভালো লাগলো। কারণ লোগো বিষয়ক ভাবনাটা অনেকদিন থেকেই মাথায় ঘুরছিলো।

এবার আমার ফেরার পালা। ঘড়িতে বেলা ১টা।কিন্তু এত সহজে কি ছাড়া পাই? আমাকে দুপুরে না খাইয়ে ছাড়বেনই না।কিন্তু সেদিন আমারও হাতে সময় নেই , অন্য একটা কাজে যেতে হবে।তাই অনেক কষ্টে বিদায় নিলাম। বিদায় নেয়ার আগে রাজ্জাক ভাই আমাকে তাঁর বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখালেন। তাঁকে কথা দিতে হলো পরে একদিন তাঁর সঙ্গে লাঞ্চ করবো।

১৯৯৬ সালের ৬ জানুয়ারীর ম্যাগাজিনে আমার লেখাটা কাভার ষ্টোরি হয়।ছবিগুলো অফিসের পিওনকে দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। ম্যাগাজিনটা পড়ে একদিন রাজ্জাক ভাই অফিসে ফোন করে আমাকে বলেন, লেখাটা খুব ভালো হয়েছে, এখন থেকে যদি কেউ আমার সম্পর্কে কোনকিছু জানতে চায়, আমি তোমর লেখাটা দেখে নিতে বলবো। বেশ অনেক বছর আগে সেই ম্যাগাজিনের প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেছে। আমার কাছেও আজ আর সেই কপিটি নেই।

তারপর আর কোনদিন তাঁর বাসায় যাওয়া হয়নি।তবে কোথাও কোন প্রোগ্রামে গেলে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে।সর্বশেষ দেখা রাজলক্ষী শপিংমলের সামনে বেশ ক’বছর আগে। রিক্সার জটলা। শপিংমলের নিরাপত্তারক্ষীরা লোকজনের সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলছিলো। কিভাবে কথাটা তার কানেও পৌছে যায়।হঠাৎ দেখা গেলো জটলার মাঝে উনি নিজেই এসে হাজির।অতঃপর তার হস্তক্ষেপে বিষয়টি নিয়ন্ত্রনে আসে।এই হলেন আমাদের নায়করাজ রাজ্জাক।বড়ো সাদাসিধে ভালো মানুষ।ইন্ডাস্ট্রিতে গার্জিয়ানের মতোই ছিলেন।চলে গেলেন যেন মাথার উপর থেকে হাতটিও উঠে গেলো।

ছবিঃ গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com