আমার দেখা খাইবার পাস…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঊর্মি রহমান

দুই.
পেশোয়ারে বেশ ক’দিন ছিলাম, আব্বার দেরাদূন ফরেস্ট ইন্সটিটিউট সহপাঠী বন্ধু আমাকে যতটা সম্ভব ঘুরে দেখিয়েছিলেন। সীমান্তের দিকে দু’টি শহর আছে, লান্ডি কোটাল ও বারা। তিনি আমাকে দু’জায়গাতেই নিয়ে গেলেন। সঙ্গে তাঁর কন্যারাও ছিলো। তাঁর স্ত্রী সম্ভবতঃ পর্দনশীন ছিলেন, তাই তিনি আমাদের সঙ্গে যাননি। ঐ দুই জায়গা সম্পর্কে বলার আগে ঐ যাত্রায় যা আমাকে সবচেয়ে মুগ্ধ করেছিলো, যা ছিলো একটি অত্যাশ্চর্য্য জায়গা, তার কথাই বলি। সেটা হলো খাইবার পাস। এই গিরিপথটি পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে পড়ছে, যার সীমানা আফগানিস্তানের সঙ্গে। এর দৈর্ঘ্য ৫৩ কিলোমিটার। এটি বিখ্যাত প্রাচীন সিল্ক রোডের অংশ। আর এই সিল্ক রূট ছিলো মধ্য এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যেকার উল্লেখযোগ্য বাণিাজ্যক পথ। অনেক নাম শোনা এই গিরিপথটি দেখে আঁশ মিটছিলো না। আমরা বেশ ওপর থেকে, একটি রাস্তার ধারে দাঁিড়য়ে দেখলাম। একটা-দু’টো গাড়ি চলছিলো। খাইবার গিরিপথে খাইবার ট্রেন চালু আছে যা মোটামুটি পর্যটকদের জন্যই করা। শুনলাম ট্রেনটা পেশোয়ার থেকে আটক খুর্দে যায়। কিছুদিন আগে শুনলাম, এখনো এটি চালু আছে এবং শুধুমাত্র এই লাইনের ট্রেনেই এখনো বাষ্পচালিত ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। পথে আসতে আসতে এই প্রদেশের বেশ কিছু বাড়িঘর দেখলাম। মাটির দোতলা বাড়ি। বিশাল গেট। দোতলার ওপরে দেয়ালে ছোট ছোট ফুটো, তা দিয়ে রাইফেলের নল বেরিয়ে আছে। শুনলাম, সেখানে নিরাপত্তার কারণেই সেটা করা হয়। নইলে হামলার আশঙ্কা থাকে। যাহোক আমরা লান্ডি কোটাল পৌঁছলাম। আগেই শুনেছিলাম অনেকে এখানে শপিং করতে আসে। কিছু স্থানে শুল্কমুক্ত সামগ্রী পাওয়া যায়। জানি না, সেগুলো বেচা-কেনা বেআইনী কিনা, কারণ সেগুলোকে সীটের তলায় লুকিয়ে রাখলো চাচার মেয়েরা। যাহোক আমি নিজের ছাড়াও মা ও বোনদের জন্যও কেনাকাটা করলাম। তারপর আমরা পেশোয়ারে ফিরলাম। ফেরার পথেও আবার দু’চোখ ভরে খাইবার পাস দেখলাম। আর একদিন গেলাম বারা, এটিও খাইবার পাখতুনখোয়া অঞ্চলের বারা তহসিলের একটি শহর। সেটিও অনেকটা লান্ডি কোটালের মত আর সেখানেও শুল্ক মুক্ত বাজার ছিলো। তবে আমার লান্ডি কোটাল বেশী ভাল লেগেিেছলো। তবে এই যাত্রায় আমি খাইবার পাস দেখে খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম, চর্মচক্ষে খাইবার পাস দেখেছি বলে নিজের ভাগ্যকে এবং সেই সঙ্গে আব্বার বন্ধু সেই চাচাকে ধন্যবাদ দিয়েছিলাম। দুঃখের বিষয় এত বছর পর তাঁর নামটা আর মনে করতে পারছি না। আব্বার সঙ্গেই তাঁর দেশভাগের পর আর দেখা হয়নি, সেখানে আব্বার মেয়েকে স¯েœহে এত যতœ করে ঘুরে দেখিয়েছিলেন এবং আদর-আপ্যায়ন করেছিলেন যে আজও তাঁর কথা মনে পড়ে। পেশোয়ার শহরও ভাল করে ঘুরে দেখিয়েছিলেন। ইসলামাবাদ একটি অত্যন্ত আধুনিক শহর ছিলো তখনই। বিরাট চওড়া কয়েক লেনের রাস্তা, রাতে সেখানে ঝকঝকে আলো জ্বলে। সেসব আমরা আগে দেখিনি। অবহেলিত পূর্ব পাকিস্তানে সেসব ছিলো না। সেখান থেকে পাট নিয়ে গিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে জুট মিল হয়েছে, কিন্তু ঢাকার উন্নয়নের কথা পকিস্তানী শাসকদের মনেও হয়নি। আমার অবশ্য ঝকঝকে ইসলামাদের চেয়ে প্রাচীন শহর পেশোয়ারকে অনেক বেশী ভাল লেগেছিলো। আব্বার বন্ধুর কন্যারা তাদের বন্ধুর বাড়িতে আমাকে নিয়ে গেলো। তাদের কাছে আমাকে দেখিয়ে তারা হয়ত খানিকটা কৃতিত্বও নিতে চাইছিলো। বোঝা গেলো ওরা পূর্ব পাকিস্তানের কোন বাসিন্দাকে কখনো দেখেনি। তবে আমাকে একদিন পেশোয়ারে থাকা এক বাঙালির বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলো। তারা আমাকে দেখে খুব একটা উৎসাহিত বোধ করেছেন বলে মনে হলো না। নিজেদের মধ্যে তাঁরা উর্দূ ও পশতুতে কথা বলছিলেন। পেশোয়ারে আমার যোগাযোগের মাধ্যম ছিলো ইংরেজি। আব্বার কল্যাণে সেই ভাষাটা আমি অল্প বয়সে শিখে গিয়েছিলাম। আমি উর্দূ পারি না জেনে আব্বার বন্ধু কন্যারা অবাক হয়েছিলো। তবে তাদের খুব কৌতূহল ছিলো পূর্ব পাকিস্তান ও সেখানকার মানুষ সম্পর্কে। উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও তার বড় শহর পেশোয়ার ঘোরা শেষ হলে আমি ইসলামাবাদ হাশেমভাই ও ভাবীর কাছে ফিরে গেলাম। আবার সেই চেয়ার কার সম্বলিত ট্রেন। ট্রেনটা অনেকগুলো পাহড় বা টিলার মধ্যে দিয়ে গিয়েছিলো মনে আছে। সেই সময় ঘুটঘটে অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিলো। তবে ট্রেন যাত্রা ভালই লেগেছিলো। সেরকম ট্রেনে চড়াও ছিলো সেই প্রথম।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com