আমার দেখা কাশ্মীর…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুব্রত গোস্বামী

ডাললেকের হাউজবোট কনসেপ্টটা কিছুটা আমাদের পাড়ার মহাদেবদার চাকাওয়ালা ‘চলমান’ টি-স্টলের মত। চাকা চারখানার নিচের দিকটা দেখতে গেলে ইঞ্চি আটেক মত মাটি খুঁড়তে হবে। দোকান প্রতিষ্ঠার দিনই চাকা চারটি শেষববারের মত গতির স্বাদ পেয়েছিল বলে খবর। এই হাউজবোট গুলোও তাই। কেষ্টপুর খালের ওপর সার দিয়ে ঠায় দাড়িয়ে থাকা ঝুপড়িগুলোকে যেন সুক্ষ্ম কাঠের কাজ করে কে ঠাকুরের সিংহাসন বানিয়ে ছাড়বে পণ নিয়েছে। রাজকীয়, মন্ত্রীকীয়, সভাসদকীয়, ভৃত্যকীয়, মান অনুযায়ী মানিয়ে নেওয়ার মত নানা কিসিমের হাউজবোট ডালে ভাসছে। তবে সব হাউজবোট গুলোই যে বেড়াতে আসা মানুষদের জন্য এমনটাও নয়। লেকের পেছন দিকটায় অনেক স্থানীয় মানুষের বসতি। বস্তিই বটে। হাট বলে ওগুলোকে। অবস্থা যা, তাতে  স্থানীয় কোনো বাচ্চা তার বাবাকে সাইকেল শেখার বায়না করলে আগে ডিঙি চড়ে ডাঙায় উঠতে হয়, হয়ত। হাট-এর সঙ্গে সঙ্গে ধুমসো একখানা বাজারও ডালের জলে ভাসমান। ৫০০টাকা ঘণ্টাপ্রতি ভাড়ার শিকারা চড়িয়ে সফি বা ইলিয়াস মাঝি আপনাকে “দেখনা ফ্রি হ্যায়, দেখ লিজিয়ে, কোয়ি বাত নেহি” বাক্যবন্ধটি উপহার দিয়ে, নির্দিষ্ট কোনও ভাসমান পসরার ‘পসন্দিদা চিজ’ এর তোড়ে ভেসে যাওয়ার খোরাক শ্রীনগর পর্বের প্রথম দিনই যোগাবেন। ভেসে ভেসে শপিং করার পরদিন সোনমার্গ থেকে ফেরার সময় আপনার এমইউ

কেষ্টপুর খালের মত ডাল লেক

ভির ফর্সা সুন্দর সারথী হিলাল-এর,”ইয়ে হোলসেল দুকান হ্যায়, ফিকস্যাট রেট মে শপিং কর সকতে হ্যায়” এর উত্তরে আপনার “হামারা শপিং তো কাল লেকমে হি হো গ্যায়া”, আর তার উত্তরে হিলাল-এর,”আরে ক্যা কিয়া?! লেক মে বহুত জ্যাদা রেট হ্যায়, শিকারে ওয়ালো কি তো কমিশন র‍্যাহেতি হ্যায়”  আপনাকে এটা ভাবিয়ে আরও ভাসাবে, যে অতিরিক্ত দেড়ঘণ্টা আপনি শপিং-এর পেছনে দিয়েছিলেন, সে অতিরিক্ত দেড়ঘণ্টার অতিরিক্ত সাড়ে সাতশ আপনাকেই গুনতে হয়েছিল কাল, সঙ্গে শিকারাওয়ালার কমিশন শিকারও অস্বীকার না করতে পারার ব্যথা। গীতিকার লিখেছিলেন,”বেমিসাল, বেনজির, কাশ্মীর”।

পর্যটনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্থানীয় মানুষেরা বলেন,’ক্যাশ-মোর’। “জিতনা ক্যাশ, উতনা অ্যাশ”। তবে পর্যটকদের অভিজ্ঞতা বলছে, ‘ক্যাশ’ এর ‘অ্যাশ’ হয়ে ওঠা এখানে মূহুর্তের ব্যাপার। তবে ছাই ওড়ালে অমূল্য রতন পাওয়া যায় এ তত্ত্বের সত্যতাও এখানে অনুভুত হতে বাধ্য। গতিসমৃদ্ধ শহুরে বেঁচে থাকার মাঝখানের কটাদিন হাউজবোটে কাটানোটা বেগতিক হওয়াই বটে। মাইকেল শ্যুমাখার, ষোলো বলে পঞ্চাশ, সাড়ে চার মিনিটে একটা আস্ত হাজার-আশি পি-এর সিনেমা ডাউনলোডের বাজারে ডিঙি বেয়ে ডিঙি থেকে সর্ষে শাক কেনা। কেত আছে বস! এয়ারসেলের পোস্টারে বিজ্ঞাপিত এমএস ধোনি ভাসমান অ্যায়তেশাম টেলিলিঙ্কের বাইরের দেওয়ালটায় হা করে অপেক্ষমান। হয়ত বা মলিন ডিঙি বেয়ে ফের‍্যান পরিহিত কোনো বৃদ্ধ এসে বলবেন,”বিস রূপিয়ে কে রিচার্জ কর দো”। হিন্দিতে লিখলাম বটে, তবে স্থানীয় মানুষ নিজেদের মধ্যে যে

বরফস্নাত ডাললেক

ভাষাটা বলেন তা হল কাশ্মীরি। এখানকার নিজস্ব ভাষা। গোলাকার অমসৃণ কাষ্ঠদণ্ডকে শিরিশ কাগজ দিয়ে আড়াআড়ি ঘষতে ঘষতে কাজাখাস্তান, তুর্কমিনেস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, এই জাতীয় শব্দগুলোকে বারংবার আওড়ে গেলে কিছুটা কাশ্মীরি ভাষার মত শোনাবে বলে আশা রাখা যেতে পারে। আর ফের‍্যান? এঁরা ফ্যারেন বলেন। কাশ্মীরের ‘জাতীয়’ পোষাক। পাতলা কম্বল অথবা মোটা প্যাণ্টের পিস অথবা ত্রিপল দিয়ে যদি হাঁটুর নীচ পর্যন্ত একটা পাঞ্জাবি বানানো হয় তাকে ফের‍্যান আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। তবে কিছু শর্ত থাকবে।

হাতা দুটোকে বগলের বদলে প্রায় কোমরের কাছাকাছি অংশে এসে যুক্ত হতে হবে, যাতে একটি হাতের সাহায্য ছাড়াই আরেকটি হাতকে কখনো হাতায় কখনো ভেতরে চালাচালি করা যায়। পোষাকটির বেড়ও যথেষ্ট বড় হতে হবে। কখনো হাতায় থাকা হাতটিকে কখনো ভেতরে ঢুকিয়ে আনার আসল কারন হল কাংরি। “রাম বনে ফুল পাড়ে”র বেতের ফুলের সাজীতে জ্বলন্ত কাঠকয়লার নিভুনিভু আগুন সাজিয়ে কখনো দুহাতে কখনো একহাতে তলপেটের কাছে সারাক্ষণ ধরে রাখতে গেলে পাঞ্জাবির প্রথাগত বেড়-এর ধারনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে বইকি। কাংরি আর ফের‍্যানের দ্বি-বর্ম প্রয়াসে সর্ষের তেল জমানো ঠাণ্ডাতেও এরা “কোই বাত নেহি” বলতে কসুর করেনা। অ্যায়তেশাম টেলিলিঙ্কের পাশের দোকানটাই মাংসের। এখানে ‘ছোটা মিট’ মূলতঃ ভেড়া। চিকেন আর বড়া মিটটাও বোঝা গেল। কলকাতায় বা ঢাকায় আপনি যেভাবে মাংসের ঝুলে থাকা দেখে অভ্যস্ত, এখানে তেমন নয়। আরো একটু বেশি দৃষ্টিকটু। গরু বা ভেড়াগুলোকে পেটের দিক থেকে আড়াআড়ি কেটে দুটো ঠ্যাং অবিচ্ছিন্ন ভাবে ঝুলিয়ে রাখা। হর্ষ ভোগলে হয়ত বিমর্ষ চিত্তে বলে উঠবেন, “কাপল অফ রানস”।

হাউজ বোট শিকারা

পেশাদার শিকারাওয়ালা ছাড়াও বাসিন্দাদের অনেকেই দেখলাম ডিঙি বাইতে পারেন। তাছাড়া ফিরিওলারা তো রয়েইছেনই। সে তিনি “ফটু খিঁচোগে স্যর” বা “কশ্মীরি জুয়েলারি লে লো , ইয়াদগারি কে লিয়ে রাখলো” যাই হেঁকে চলুন, দাঁড় টানতে জানাটা তার কাছে মাদারটাং-এর মত। আমি নিশ্চিত, টেবিল টেনিস ব্যাট আর যজ্ঞি বাড়ির পাচকের খুন্তির মধ্যে বিয়ে হলে শিকারার দাঁড়ের মত একটা সন্তান হত। কোনোটি আবার হৃদাকৃতি। যব যব ফুল খিলে পরবর্তী পর্যায়ে এ আকৃতি বাধ্যতামূলক ছিল বটে। যদিও কাশ্মীরি পটভুমিকায় রোম্যাণ্টিক সিনেমার অভাব নেই দেশে, তবুও এ জনারের সিনেমা বলতে প্রথমেই  মনে পড়ে “কাশ্মীর কি কলি”র কথা। তবে শ্রীনগরে এসে মনে মনে হল সিনেমাটিতে ফুল অর্থেই কলির ব্যবহার। পথেঘাটে কেষ্টবাবুর কলির এখানে বড্ড অভাব। অন্তত আমার চোখে তো আরাম বয়ে আনেনি কেউ। জান-বেকারিতে চিকেন প্যাটি খেতে খেতে এক মহিলাকে চোখে ধরেছিল। ব্যাস ওইটুকুই।  বৌ সঙ্গে ছিল তাই ভালো করে দেখতে পারিনি তবুও কোনো আফশোষ নেই গোছের সুন্দরী আর কী।

আমরা যে হাউজবোটটিতে ছিলাম সেটার নাম ছিল শিরিন। মালিকের নাম ইউসুফ। ছেলে উমর আর বাপ মিলে ট্যুরিস্ট ডিল করে। এই বোটের নিজস্ব শিকারার গায়ে উমর ডিলাক্স লেখা দেখে অনুমান করে নিয়েছিলাম কন্যার নামেই হাউজবোটের নাম রাখা। আমার মেয়ের কাছে ব্যাপারটা দেখলাম ভালো ঠেকেনি। ওর হিসেব মত ছেলেটার নামে ওই এককুঁচি শিকারা আর মেয়েটার নামে দুখানা সুপারডিলাক্স হাউজবোট। শিরিন আর ইয়ং শিরিন। এমন কি

আমি আর গুনগুন

ওয়াইফাই কানেকশনও মেয়ের নামে! এইচ বি শিরিন। এ ভারী অন্যায় ছ-ছটা রাত হাউজবোটের মায়াময় স্নিগ্ধ আতিথেয়তায় কাটিয়েছিলাম। অমন আবহ আগে কখনো অনুভব করিনি। একটা থ্রি বিএইচকে ভাসমান ফ্ল্যাট যার দেওয়াল জানলা মেঝে সিলিং সব কাঠের। অনুজ্বল আলোর সাথে পর্দা গালিচা চাদরেরা যেন কবে থেকে সই পাতিয়ে রেখেছে। বাইরের জলমাখা ঠাণ্ডা হাওয়ায় জবুথবু হয়ে লোকাল স্ট্রিটফুডের প্ল্যান সেদিনের মত বাতিল করা তিনটে মানুষের ঘরবন্দী মনেরা তখন বুখারির আঁচে সুখ পোহাচ্ছে।

-“কোই ট্যানশন নি, আম রাআতকো ওর লকড়ি ডাআআল দেগা। আপ বে ফিক্র্ রোহ্। আরাআআমসে সোনা। ছোটু রাআতকো চিকিন্ কাওগি?” লোকটার নাম বশির। বছর পঞ্চাশেক হবে।  হাউজবোটের হাউজ কিপিং স্টাফ্। আমাদের দেখাশোনার ভার ওঁরই। আমার মেয়ে সে রাত্তিরে বশির মিঞার ‘চিকিন’ খেতে পারেনি। জান বেকারির বাখরখানি চকোলেট পেস্ট্রি সব পেটে ঘুরপাক খাচ্ছিল। ইলেক্ট্রিক ব্ল্যাঙ্কেট আর বুখারির দ্বিফলা উষ্ণ আলিঙ্গনে রচিত নিদ্রার সমাপ্তি হল পরদিন সকালে, টিনের চালে দাঁড় বাওয়ার শব্দে। সারারাত তুষারপাতের পর সকালে কিছুটা কমেছে তাই কাঠের বেলচা দিয়ে হাউজবোটের চালা থেকে পুরু বরফ সরাতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় লেগে পড়েছে সবাই। নৌ-ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা দেখতে বেশ লাগছিল। “আজ্ ব্যায়ডটি থোড়া ল্যাট্ হোগা সাব” শুনে আমার স্ত্রী গোমরা আর আমি কামরামুখো হচ্ছিলাম।  দেখলাম ডাইনিং টেবিলে সুচারু পাত্রে ঢাকা দিয়ে রাখা আমার মেয়ের রাতের খাবার। ‘চিকিন’। কিছুক্ষন পর “সাব আপকা ব্যায়ডটি তেয়ার” বলা মানুষটাকে ডাইনিং টেবিলে পড়ে থাকা খাবারের কথা জিজ্ঞাসার উত্তর আমায় অনেকদিন আগে শোনা একটা লাইন মনে করিয়ে দিল।( চলবে )

ছবি : লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com