আমার দেখা কাশ্মীর (শেষ পর্ব)

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুব্রত গোস্বামী

প্যাহেলগামে এসে শুনলাম আরুর পথ বন্ধ। শুধু বরফ বরফ আর বরফ। হোটেলগুলোর আশেপাশে জনমানবের চিহ্নটুকুও খুঁজে পেলামনা।  মোটা বরফের আস্তরণে ঢাকা কটেজের চালারা যেন ন্যাড়া চিনার গাছেদের সবুর সইতে বলছে। একটি ঘোড়ায় আমার স্ত্রী এবং আরেকটিতে আমি আর আমার কন্যা। ওর বসতে অসুবিধে হচ্ছিল বলে অশ্ববালকটি নিজের পরনের ফের‍্যান খুলে স্যাডেলের সামনের দিকে একটু গদি বানিয়ে দিল। “ওর আপকা ইয়ে কেম্রে আমকো দে দো। আম আচ্ছে ফোটু খিঁচ দেঙ্গে।” ওর আবদারে আমাকে আর আমার স্ত্রীকে  পৃথক দুটো ঘোড়ায় বসে ধরম-বীর সিনেমার ধর্মেন্দ্র-জীতেন্দ্রর মত হাত ধরাধরির পোজ দিতে হয়েছিল। মিনি সুইজারল্যান্ড নামের একটা পয়েণ্ট আছে। যদিও এই ধরনের “ইণ্ডিয়ান নায়াগ্রা” “বাংলার গ্র্যাণ্ড ক্যানিয়ন” “স্কটল্যাণ্ড অফ ইস্ট ইণ্ডিয়া” নামগুলোতে আমার বেশ আপত্তি আছে, তবু উপায় নেই দেখে বলতে হচ্ছে। সেই মিনি সুইজারল্যাণ্ডে পৌঁছে দেখি আমরা ছাড়া আর কোনো পর্যটক নেই। গোটা দশেক ফিরিওলা দাঁড়িয়ে আছেন। হাঁটু পর্যন্ত ঢুকে যাওয়া বরফে দাঁড়িয়ে তাঁরা খদ্দেরের অপেক্ষায়। দরদস্তুর করে বেশ সস্তায় দুটো পশমিনা কিনে নিলেন আমার স্ত্রী। শুনশান প্যাহেলগাম আমার শালির কপালে একটা পশমিনা জুটিয়ে দিল দেখলাম।

ফেব্রুয়ারির কাশ্মীর আপনাকে বিশ্বাস করতে দেবেনা, আশেপাশে যে আপেলগাছগুলো আপনি দেখছেন তার মধ্যে এখনো প্রাণ আছে। হিলাল বলল আর দু-মাস পরই নাকি সব “গ্রীন গ্রীন” হয়ে যাবে। চিনারপাতা, আপেল বাগান, টিউলিপের লোভ দেখিয়ে পরেরবার মে-জুনে আসার নেমন্তন্ন করে রাখল। “বর্ফ তবভি মিলেগি। খিলানমার্গ হ্যায় না।” পড়ন্ত আলোয় নেড়া আপেল গাছটা তখন আমার ক্যামেরায় সিল্যুয়েট ফ্রেমে বন্দিদশা প্রাপ্ত। হাউজবোট, শিকারা, তুষারপাত, শেভ্রলে ট্যাভেরা, বরফের মরুভূমি, পুলওভার এই সবকিছু ভুলে মন যেন কেমন কলকাতা কলকাতা করছে।

পরদিন সকালে পাশের হাউজবোট ইয়ং শিরিনের বোর্ডারদের কাছে শুনলাম তুষারপাতের কারনে দুদিনের সমস্ত বিমান বাতিল করা হয়েছে। দিল্লির সেই পরিবারটি পাঁচদিন পরের বিমানে জায়গা পেয়েছেন। জম্মু যাওয়ার রাস্তা বন্ধ, কাজেই ট্রেনের প্ল্যান করেও লাভ নেই। দুদিনের জায়গায় ফ্লাইট ক্যানসেলের ব্যাপারটা তিনদিন হলে আমাদেরও বিপদে পড়তে হত। তবে নিশ্চয়তা নেই, জানতে পারলাম রানওয়ের বরফ না গললে বাতিল হতেও পারে। চিন্তায় হাবুডুবু খেয়ে ইউসমার্গ দেখায় ফাঁকি দেওয়ার কোনো মানেই হয়না। যীশু নাকি স্বয়ং পদার্পণ করেছিলেন এই ইউসমার্গ-এর মাটিতে। পৌঁছনোর পথখানি অনবদ্য। এখানে গাছে পাতা রয়েছে দেখলাম। সরু পথ, দুধারে সার দেওয়া গাছ আর নিচে জমে থাকা উঁচু বরফ। না ছুঁয়েই বোঝা যাচ্ছিল গুলমার্গ যাওয়ার পথের মত শক্ত নয়। বিপত্তি হল উল্টোদিক থেকে আরেকটা গাড়ি এসে পড়ায়। আমাদের গাড়িটাকে এক কিলোমিটার মত পিছতে হল। একটু চওড়া জায়গা কে পিছলে পাওয়া যাবে এ ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে সমঝোতা আছে দেখলাম। গাড়িতে রাহত ফতে আলির গান বাজছে আর সরু বাঁক নেওয়া বর্ফিল পথ। প্রকৃতি যেন লাইভ ওয়ালপেপার হয়ে আমাদের সামনে হাজির। একেকটা বেড়ানোর সঙ্গে একেকটা গান যেন কীভাবে জডিয়ে যায়। সারাজীবনের জন্য। নিরানব্বই-এর দার্জিলিং সফরে সাইটসিয়িং-এর জন্য যে গাড়িটা ভাড়া নিয়েছিলাম তার কাছে একটাই ক্যাসেট ছিল। মন-এর। “কিউ ছুপাতে হো মনকি বাত” শুনলে এখনও দার্জিলিং চোখে ভাসে। দু-হাজার পনেরোয় হিলালের পেনড্রাইভময় রাহত ফতে আলি। “গুমসুম গুমসুম প্যারদা মওসম, আজ না দর্দ জাগানি” ইউসমার্গের ঝিরিঝিরি তুষারপাত যেন রাহত দেখতে পাচ্ছেন। “হাল্কি হাল্কি বরসে বদরি, সজনা দুর না জানি।” শব্দের হেরফেরে ভাবের কিছু যায় আসেনা। পথটাকে শেষ হতে দিতে মন চাইছিল না। একটা গাড়ি পেছন ফিরে আমাদের গাড়ির দিকে ধেয়ে আসছে দেখলাম। হিলাল গাডি থামিয়ে নামল।

– গাড়ি অওর নেই জায়েগি। আগে রস্তা বান্ধ হ্যায়। উধ্র ঘুমানেকা ভি জগাহ্ নেহি। ওর দুধ গঙ্গা ভি জম গয়া। যানে সে কোই ফায়দা নেহি।

ওগাড়ি এগাড়ি দুটো পরিবার মিলে ওই জায়াগাটাকেই ইউসমার্গ বানিয়ে নিলাম। আমাদের চোখে ওটাই ইউসমার্গ। পেঁজা তুলোর মত তুষারপাত, নরম নীলাভ বরফ, দুটো গাড়ির চালক সহ নজন মানুষ, পাইনগাছের সারি আর একটু দুরের বরফডোবা একটা কুঁড়েঘর। তবে গতকাল থেকে যে “কলকাতা কলকাতা মন কেমন” রোগটা এঁটে বসেছে সেটা এই স্বর্গশোভাও সারিয়ে তুলতে পারছিলনা। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত তুষারপাত বিমান বাতিলের হুমকি দিয়ে চলেছে। নিজের শহরের টান কিছুক্ষণ আগের চোখের আরাম গুলোতে দুর্যোগের মোড়ক লাগাতে চাইছে। হোম সিকনেস-এর কোনো ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। শুধু জানি আমি শহরে ফিরতে চাই। নিজের শহরে।

সকালে জলখাবার সেরে হাউজবোটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছি তিনজনেই। শিকারা সামনেই বাঁধা। সফি এলেই আমাদের নিয়ে যাবে। আর কয়েকঘণ্টা পরেই ডাললেকটাকে কল্পনায় বা ছবিতে ছাড়া দেখার উপায় থাকবেনা। কয়েকঘণ্টা পরেই অটোওলার গলায় “ছ’টাকা খুচরো দিন” পাশের ফ্ল্যাটের টিভি থেকে সুমুনের গলায় “এমন এক ঘণ্টা যা আপনার ভাবনা বদলে দেবে” বৌ-এর গলায় “বাপির দোকান থেকে ছটা ডিম, একটা পাঁউরুটি, একটা বাওলি ক্রোশাঁ আর দুটো দুধ” এই আওয়াজগুলো শুনতে হবে। তবু কান অপেক্ষা করে আছে সেসবেরই। সফির শিকারা চড়ে ডাঙায় এসে দেখলাম আজ একটা অন্য গাড়ি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। হিলাল অন্যদের নিয়ে গুলমার্গ গেছে শুনলাম। গাড়ি এগিয়ে চলল এয়ারপোর্টের দিকে। আর আমরা ঘরের দিকে। সেদিন আর গাড়িতে রাহত ফতে আলির গান বাজলনা।

ছবি:লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com