জার্ণাল থেকেঃ আমার ছেলের পিঠাপ্রীতি

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাগুফতা শারমীন তানিয়া

আমার ছয় বছরের ছেলে কুশানের খুব পিঠপ্রীতি হয়েছে, দু’টি পিঠার নাম জানে সে, বিবিখানা পিঠা আর লবঙ্গলতিকা। সে সকালে নাস্তা করে পিঠা, বিকালেও নাস্তা করে পিঠা। ইস্কুলে তার প্রাণের বন্ধু সকালে মাঝে মাঝে চিতুই পিঠা খেয়ে স্কুলে যায় শুনে সে মুখ বাঁকিয়ে বলেছিল, কী আজব!

আমিও আরেকটু মুখ বাঁকিয়ে বলেছি, এহ তুমি জানো পিঠায় কত এনার্জি?

 -এইজন্য আয়ান এত দৌড়াতে পারে মেমে?

 আমি উদাসমুখ করে বলি, হতেই পারে।

 এরপর থেকে প্রত্যেকদিন তার এক বুলি, “হোয়েন উইল ইউ মেইক ফিটা?”

সাটিন

কুশান আজ সকাল থেকে ফিটা/পিথা/পিটা এইসব করতে করতে আমাকে ঘুম থেকে তুললো। আমি কাঁদোকাঁদো হয়ে বললাম- আমার কাজ আছে। আমার হাঁপানি আছে।আমার দুঃস্বপ্ন আছে, কে জানি আমার শাদা বেডশিটে সাইনপেন দিয়ে রগরগে একটা চিঠি লিখে দিয়ে গেছে! ইত্যাদি।

কিছুই লাভ হলো না, আড়কালা লোকের মতন কুশান অপাঙ্গে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কেন, বিবিখানা পিটাও নাই?”

-তিন বেলা পিঠা খেলে থাকবে কেমনে?”

তার ইস্কুলে ইন্টারন্যাশনাল উইক হচ্ছে, বাংলাদেশী রান্না নিয়ে যাবেই যাবে সে, এই তার পণ। আমি বিশ্বন্যাকার মতন জিজ্ঞেস করি, “কোন দেশী খাওয়া নিতে বলছে জানি?”

শিশুর মন দুষ্ট মায়ের বারেবারে শুনবার অভিসন্ধি টের পায় না, অম্লানবদনে জবাব দেয়, “যার যার দেশের জিনিস নিয়ে যেতে বলেছে। লোকে খেয়ে বলবে কোনটা ভাল।”

আকাশপাতাল ভাবলাম, একেবারে বাংলাদেশী রান্না কি দেয়া যায় ইস্কুলে, যেটা প্রতিযোগিতায় টিকবার মতো? বিরিয়ানি না, কাবাব না। চটপটি-ফুচকা এইসব হাফগেরস্ত না। আমি তো গোটা বাঙালজীবন বরাবর ঝোলে সাঁতার দিয়েছি আর ঝিঙের কি বেগুনের ডিঙিতে উঠেছি। চোখের সামনে কিছু পুর ভরা পটল আর চিরে নেয়া কাঁকরোল নাচানাচি করে আলোর পোকার মতো বাতাসে মিশে যাচ্ছে বারবার। গত দেড়মাস বাংলাদেশে অবিরাম সোলেমানপাই (সোলেমানভাইকে এইই ডাকে কুশান)আর আম্মা এই দুই ‘রন্ধনে দ্রৌপদী’র রান্না খাওয়ার পর থেকে আমার রান্নায় মতি চলে গেছে। আমার একটুও রাঁধতে ইচ্ছা করে না। যাই হোক, রান্নাঘরে কোনোমতে গিয়ে গাজর-মটরশুঁটির সবজিপোলাও রাঁধলাম, আম্মা যেভাবে রাঁধতো, আদার আস্ত ফালি আর শাজিরা দিয়ে। নামাবার আগে সামান্য দিশি ঘি। আমি একটু কাজুও ভেজে দিয়েছি, ইন্ডিয়াফাইড হয়ে যাচ্ছে জেনেও, আর সামান্য নারকেলগুঁড়ো।লেবুপাতা খুঁজবার সময় নেই। গরম পোলাও নিয়ে দুইজনে দৌড় দিলাম ইস্কুলে।

ফিরে আসতে আসতে দেখলাম মাথায় বাজছে প্রিলুড-ইন্টারলুডসহ – ‘একটি পারুল বোন আমি তোমার, আমি সকাল সাঁঝে শত কাজের মাঝে তোমায় ডেকে ডেকে সারা…’ , আজকে তো আমার ভাইয়ের জন্মদিন, আমার এক্সপেরিমেন্টাল কুকিং এর একমাত্র গ্রাহক, আরেক গ্রাহক ছিল বাসার কুকুরটা, সেও নাকি সহ্য করতে না পেরে সায়েদাবাদ পালিয়ে গেছিল। প্রথম যেদিন বারবিকিউ সস দিয়ে মুরগী রেঁধেছিলাম, সে খেতে বসে বলেছিল, “রে দুর্মতি, তামাকু দিয়া রামপাখি রাঁধিয়াছিস!”

রোদ উঠেছে আজকে ধূসর লন্ডনে, তাত আছে এমন রোদ। বাগানের গেট ঠেলে ঢুকতে দেখি হায়াসিন্থগুলি সবক’টা ফুটেছে। ব্লুবেল গজিয়েছে ছায়ায় ছায়ায়, ড্যাফোডিল ফুটেছে টুলশেডের পাশে,সপ্তাহ দুইয়ের ভেতরে টিউলিপগুলি ফুটে যাবে, গোলাপঝাড়ে এসেছে নতুন তামাটে পাতা, এই ঝাড়ের তলায় আমার হারিয়ে যাওয়া বেড়াল সাটিনের পেটের মাপের গোল হয়ে ঘাস দেবে থাকে সারা গ্রীষ্ম- ওর প্রিয় জায়গা। একবার ডাকলাম- সাটিন!

প্রতিধ্বনিও ফিরলো না।

কুশান

পড়িমড়ি করে কুশানের ইস্কুলে গেলাম দুপুরে, নানান জাতের মানুষ রঙিন খাদ্যের পশরা মেলে বসেছে ইন্টারন্যাশনাল উইকের ফুড ফেস্টিভ্যাল ইভেন্টে। সারিবদ্ধভাবে পাকিস্তানী, ভারতীয় এবং সিলেটীরা (কেননা এখানে সিলেট একটি দেশের নাম) বসেছে বিরিয়ানি এবং কাবাব নিয়ে। বুলগেরিও এক মহিলা এনেছেন পোগাচা, দারুণ ফুলোফুলো চিজ দেয়া রুটি। থাই মহিলা এনেছেন ফ্রায়েড রাইস আর স্টারফ্রায়েড ফিশ। আমার জাপানী বন্ধু ইয়োকো (আকির মা) বানিয়েছে সুশি এবং আগার আগারের দৃষ্টিনন্দন ছোট ছোট জেলি। থাই মহিলা আমার পাশের এক বাঙালি মহিলাকে খাবার সাধলো, মহিলা রাইস একটু খেয়েই আঁতকে উঠে বল্লো- “মুরগি, ইইইইক, হালাল তো? এই আপা?” আমি কানে শুনতে পাই না এইটা অর্ধসত্য এবং সেটা আমি সত্য হিসেবে মাঝেমাঝে ব্যবহার করি।

-এই আপা, শুনেন না, এইটা হালাল কি না তা তো জানি না। আপনি জানেন?”

আমি একগাল হেসে বললাম, তাইলে মাছ খান।

-উঁহু, লেগে গেল যে একসাথে।

কিছুক্ষণ পরে মহিলা আমার কাছে এসে বললেন, আমি আসলে রোজা, কিছুই খাব না।

-ও আচ্ছা।

রোজাদার একটা টিফিনবাটি যোগাড় করে এনে তাতে এন্তার ডেজার্ট ভরলেন, রোজা ভাঙলে খাবেন ঘোষণা দিলেন। আমি আর সেবাস্টিয়ানের ফিলিপাইনি মা মনের সুখে গুলগল্প করলাম। ইয়োকো সুইট আর সেভরী উভয় বিভাগে প্রথম হলো। পাকিস্তানি মহিলারা খুব ক্ষেপে বলতে লাগলেন, “চিঙ্কি কো সবকুছ দে দিয়া।”

আহা,গুলে দিলেই যদি জাতে জাতে সমসত্ত্ব মিশ্রণ হতে পারতো!

ছবি: লেখক সৌজন্যে

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com