আমার গুরু সাযযাদ কাদির

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কাজী জহিরুল ইসলাম

কবি সাযযাদ কাদিরের সঙ্গে আমার নিবিড় সখ্য গড়ে ওঠে ১৯৯১ সালে। তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় আরো কিছুকাল আগে। আমি ব্র্যাক-এর চাকরী ছেড়ে দিয়ে ঢাকায় চলে আসি। দু’বছর হবিগঞ্জে ছিলাম। সব সময় মনে হতো কী যেন মিস করছি। শিল্প-সাহিত্য সব হয়ে যাচ্ছে আমাকে ছাড়াই। ১৯৯১ সালের শেষের দিকে একদিন হবিগঞ্জের ব্র্যাক-অফিস থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাসস্ট্যন্ডে চলে আসি। একটি বাস তখন ঢাকায় যাচ্ছে, আমার বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। মনে হচ্ছিল এই বাসটি বাংলা সাহিত্যের তীর্থযাত্রী। আমাকে এক্ষুনি উঠে পড়তে হবে। আমি লাফ দিয়ে উঠে পড়ি। ব্যাস, এভাবেই আমার ব্র্যাকের কর্মজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। কিছুই নিয়ে আসিনি। আমার বই-পত্র, কাপড়-চোপড় সব ফেলে এসেছি। চাকরী থেকে ইস্তফাও দিই নি।

ঠিক মনে নেই কোথায়, তবে ঢাকায় এসেই দেখা হয় সাযযাদ ভাইয়ের সঙ্গে। আমাকে বলেন, এই কবি, আমি দিনকালে আছি, লেখা নিয়ে এসো। কবিতা দিতে গিয়ে আটকা পড়ে যাই। তিনি তখন ফিচার এডিটর, আমাকে বানিয়ে দিলেন তাঁর অবৈতনিক সহকারী। প্রচুর লেখা ছাপতেন আমার। সেই সময়ে সাযযাদ ভাইয়ের উৎসাহে প্রচুর গদ্য লিখেছি। সেইসব লেখার জন্য আমাকে বেশ ভালো বিল দিতেন। ওইটুকুই আর্থিক প্রাপ্তি। সপ্তাহে দুইদিন দিনকালে যাই। সাযযাদ ভাইকে এডিটিংয়ে সাহায্য করি। লেখা জোগাড় করে দিই। তার চেয়েও বড়, তাঁকে সঙ্গ দিই। তিনি মজার মজার গল্প বলেন। একদিন বলেন, তুমি রাজু আলীম নামে কাউকে চেনো? আমি বলি, হ্যাঁ চিনিতো, আমাকে ও ‘বন্ধু’ বলে ডাকে। তোমার বন্ধু এসেছিল। এসে আমাকে আক্রমণ করেছে। আমি অবাক হই, আক্রমণ করেছে মানে কী? সাযযাদ ভাই বলেন, আমাকে অনেক গালাগালি করলো। বললো, কাজী জহিরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের কে? আপনি প্রত্যেকদিন তাঁর লেখা ছাপেন? আমি খানিকটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে যাই। আপনি কিছু বলেন নি? না আমি কিছু বলিনি। যা বলার দারোয়ান বলেছে। দারোয়ান বলেছে মানে কী? দারোয়ান ওকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে। এই গল্প যখন বলছেন তখন সাযযাদ ভাইয়ের কন্ঠ স্বাভাবিক, হাসি বা দুঃখ কিছুই নেই। রাজু আলীম কবি। এক সময় ভাল কবিতা লিখতেন। এখন লেখেন কিনা জানি না। অনেক পরে একদিন আমি তাকে এই ঘটনা জিজ্ঞেস করি। জিজ্ঞেস করি একুশের বইমেলার মাঠে। তখন আমি বিয়ে করেছি, আমার স্ত্রীও সঙ্গে ছিলেন। ঘটনার জন্য রাজু দুঃখপ্রকাশ করে এবং আমার হাত চেপে ধরে ক্ষমা চায়। রাজুর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব এখনও আছে, যদিও অনেকদিন যোগাযোগ নেই।

আরেকদিনের ঘটনা বলি। দিলীপ কুমার আসছেন বাংলাদেশে। আমাকে বলেন, তুমি দিলীপ কুমারের একটি ইন্টারভিউ নিয়ে আসবে। আমি বলি মাথা খারাপ, আমিতো তাঁর সম্পর্কে কিছুই জানি না। কিভাবে ইন্টারভিউ করবো। তখন তিনি আমাকে জানাতে শুরু করেন। গড়গড় করে মুখস্ত বলে দিচ্ছেন দিলীপ কুমার অভিনীত সব ছবির নাম, তাঁর কো-আর্টিস্টের নাম। এমন কি পরিচালকদের নাম পর্যন্ত। তখন নিজেকে এতো ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিলো। আমিওতো কত ছবি দেখেছি, দিলীপ কুমারের না হোক অন্য অনেক অভিনেতার ছবি দেখেছি। কিন্তু কয়টা ছবির নাম মনে আছে? আর পরিচালকের নাম? প্রশ্নই ওঠে না। সিনেমা জগত সম্পর্কে সাযযাদ ভাইয়ের ছিল অগাধ জ্ঞান। প্রচুর ছবি দেখতেন আর প্রচুর বই পড়তেন। তিনি যখন এডিট করতেন একটি অশুদ্ধ বাক্যও তাঁর চোখ এড়াতো না। আমার ধারণা এমন কোনো বাংলা বানান শব্দ নেই যা তিনি জানতেন না। তিনি লিখতেন যা তার চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশি পড়তেন। অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী একজন মানুষ ছিলেন সাযযাদ কাদির। আমার একটি বড় উপকার করেছিলেন তিনি। একদিন বললেন, কবিতায় ক্রিয়ার ব্যবহারের ক্ষেত্রে চেষ্টা করবে প্রেজেন্ট ইন্ডেফিনিট টেন্স ব্যবহার করতে। এরপর থেকে আমি এই উপদেশ মেনে চলি। ক্রিয়ার এই ফর্মটি কবিতাকে অনেক বেশি সর্বকালীন করে তোলে। খুব অল্প সময়ের জন্যে হলেও কবি সাযযাদ কাদির প্রকৃতপক্ষে ছিলেন আমার একজন শিক্ষাগুরু। তাঁর কাছ থেকে নানান বিষয়ে অনেক কিছু শিখেছি।

সকালে ঘুম থেকে উঠে ফেইসবুক খুলে দেখি, কবি সাযযাদ কাদির আর নেই। দেখেই মনটা বিষাদাক্রান্ত হল। আমরা সবাই একদিন চলে যাব। আজকাল মৃত্যু সম্পর্কে আমার তেমন কোনো ভীতিও নেই। মৃত্যু জীবনকে পূর্ণতা দান করে। এই অনিবার্য সত্যকে সানন্দে মেনে নেওয়াই ভাল। তবু প্রিয়জনের মৃত্যুতে কোথায় যেন একটা ধাক্কা লাগে। নিউইয়র্কে এখন বসন্ত। এই বসন্তে তিনি চলে গেলেন। তাই কবি সাযযাদ কাদিরের “বসন্তে একদিন” কবিতাটি উদ্ধৃত করেই তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করছি-

বসন্তে একদিন

একবার এমনি এক বসন্তের দিনে
লুশান-এর চূড়ায় উঠে উধাও নীলিমার দিকে তাকিয়ে –
আরেকবার
হুয়াংশান-এর চূড়ায় দাঁড়িয়ে
মনে হয়েছিল
ঝাঁপ দিই মেঘের সমুদ্রে –
উড়ে যাই নিঃসীম অনন্তের বুকে!

একবার ঠিক বুঝেছিলাম একটু পরেই বন্ধ হবে বুকের ধুকপুক
তাই চোখ বুজে ছিলাম আগে থেকেই
একবার মনকে বোঝানোর আশায়
বিছানায় এ পাশ ও পাশ করেছি সারা রাত
একবার জেনে-শুনে পান করেছি যন্ত্রণাবিষ
কাতর হয়েছি সয়ে-সয়ে শতেক জ্বালা
একবার মুখ ফিরিয়ে তার চলে যাওয়ার পরও
অপেক্ষায় থেকে নিয়েছি পরম প্রেমের স্বাদ
আবার একদিন কোনও কারণ ছাড়াই
একাই হেসেছি, একাই গুনগুন করেছি গান
একবার শুধু তাকেই বেসেছি ভাল যে বাসে না
বাসবেও না কোনও দিন।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com