আমার এডিনবরার বন্ধুরা…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেখ রানা (এডিনবরা, স্কটল্যান্ড থেকে)

এক.

কারো নাম যে ‘গাই’ হতে পারে সেটা গাই এর সঙ্গে পরিচয়ের আগে কল্পনাও করিনি।

এ প্রান্তে নামের নানাবাহার মাঝেমধ্যেই চমকে দেয়। এই শীতের মুলুকে নামের বৈচিত্র্য আবহাওয়ার একঘেয়েমীর সঙ্গে বৈসাদৃশ্য ল্যান্ডস্কেপ তৈরি করে। এখন অবশ্য এডিনবরাতে আকাশের মন ভালো। ঝকঝকে রোদ ওঠে প্রায়দিন।

এক বিন্দু স্থির থাকতে পারে না গাই। কাজ শুরুর প্রথম দিকেই ওর সঙ্গে পরিচয় আর সখ্য। আমার গায়ের রঙ দেখে যথারীতি ধরেই নিয়েছিল আমি ইন্ডিয়ান। বাংলাদেশি বলাতে একটু বিব্রত বোধ করে বোধহয়। কারণ ইন্ডিয়ান মনে করে ও হিন্দি ভাষায় কথা বলে আমাকে চমকে দেবার প্রয়াস পেয়েছিল। প্রথম কথাই ছিল-

‘হাট টো মেলাও মেরে বাই।’

স্কটিশ গাই এর মুখে হিন্দি বচন শুনে আমোদ বোধ করি। কাজ শেষে গাই ধন্যবাদ জানায় শুকরিয়া বলে। কিছুদিন পরে ওকে বাংলায় ধন্যবাদ শব্দটা শেখাই।

‘ডানেওয়াবাদ’- বলেই উৎসুক মুখে তাকিয়ে থাকে থাকে ঠিকঠাক হয়েছে কিনা জানার জন্য। আমি স্মিত হেসে জানাই কাছাকাছি।

গাই এর মুখে হিন্দি বাংলা শুনে ভালোই যাচ্ছিল আমার অনলাইন শপিং এর পার্ট টাইম কাজ। ইত্যবসরে অড জব এর একটা ভালো বাংলা শিখেছি। অমানানসই কাজ। সেলফির বাংলা ‘নিজস্বী’-র মত এটাও মনে ধরেছে।

সেদিন কাজ শেষ হবে হবে করছে, গাই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে আমার কাছে।

এক ফ্রেমে তাইওয়ান এর হান্নান, ফ্রান্স এর অন্থুয়ান, ভারত এর নাচুশীলা, ম্যাকাও এর ইয়েন আর লেখক

‘কি ব্যাপার?’

‘ঘন্টাখানেক বেশী কাজ করতে পারবে আজ?’

রীতিমত অনুনয়ের ভঙ্গিতে গাই প্রশ্ন করে।

আমার লোয়ার ব্যাক এর ব্যথা আমাকে না করে। কিন্তু গাই এর ভঙ্গি দেখে আমি সম্মতি জানাই।

‘বাগ ওয়ান কে লিয়ে।’

গাই এর মুখে অদ্ভুত বাক্য শুনে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। প্রথমে বুঝে উঠতে পারিনা স্কটিশ না হিন্দি- কি বললো। গাই দাঁড়িয়েই থাকে হাসিমুখে। অনুপল পরে অদ্ভুত হিন্দি বাক্য হৃদয়ঙ্গম করি।

হাসতে হাসতে কাজ শুরু করি। ভগবান কে লিয়ে-র মত জটিল বাক্য কোথায় শিখলো জিজ্ঞেস করতে হবে একদিন।

দুই.

‘তুমি চীন থেকে এসেছো?’

বলেই হান্নাহ-র অভিব্যাক্তি দেখে বুঝে ফেললাম ছোট্ট ভুল করে ফেলেছি। চেহারার আদল দেখেই চাইনীজ কিনা জানতে চাওয়াটা খানিক বোকামী হয়ে গেছে। ঠিক যেমন আমাকে দেখলে বেশিরভাগ স্কটিশ আমি ভারতীয় কিনা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বিব্রত হয়।

তাইওয়ানিজ হান্নাহ সদা হাসিখুশী মানুষ। সেইন্সবারি-তে ওর সঙ্গেই আমার প্রথম বন্ধুত্ব। দু’জন একইসময়ে অনলাইন শপিং এর কাজ করি আর কাজের অবসরে দু’ দন্ড থেমে গল্প করি অনুপল।

চীনদেশের কথা শুনে হান্নাহ-র বিরক্তির কারণ টের পাই কিছুদিন বাদেই। আমরা যেমন একদিকে ভারতীয় আগ্রাসনে হাঁসফাঁস করছি, অন্যদিকে নতজানু অনেকেই সেই স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে বিমলানন্দে আছে… তাইওয়ান এর অবস্থাও প্রায় কাছাকাছি। শুধু কুশীলব বদলে গেছে।

হান্নাহ-র ভাষ্যমতে ওরা চাইনিজ তাইপে হয়ে পরিচিত হতে চায় না, দেশের অফিসিয়াল নাম থেকে চীন এর নামটা সমূলে মুছে ফেলতে চায় বরং। তরুনেরা নিজেদের তাইওয়ানিজ হিসেবেই পরিচয় দিতে ভালোবাসে কিন্তু ওদের পুরোনো রাজনীতিবিদদের অনেকেই চীন তোষনে ব্যস্ত। বড় দেশের কাছে কূলে গুটিশুটি মেরেই বাকি জীবন কাটাতে চায়।

হান্নাহ আর ওর ফ্রেঞ্চ বর অন্তোয়ান একদিন আমাদের বাসায় বেড়াতে এলো। গল্প হলো বাংলাদেশ, ফ্রান্স আর তাইওয়ান নিয়ে এন্তার। ওদেরকে বাংলাদেশী আলুর চপ ভেজে খাওয়ালাম। সে এক মুহূর্ত বটে! আলুর চপের বিশাল ভক্ত হয়ে গেলে হান্নাহ। কপ কপ করে চপ খেতে খেতে আমার কাছে বাংলাদেশের গল্প শুনতে চাইলো। ও ১৯৭১ এ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অল্প বিস্তর জানে। নিজে আর্কিওলোজি নিয়ে পড়াশোনা করায় ইতিহাসে বেশ আগ্রহ।

ওকে কথা দিলাম অন্তর্জালে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এর সঠিক রেফারেন্স খুঁজে দেব।

তিন.

পরিচয় আর বন্ধুত্ব হলো ম্যাকাও এর ইয়েন, দক্ষিন ভারতের চেন্নাই এর নাচোশীলা, স্কটিশ টেরি আর ক্যাফেতে কাজ করা স্কটিশ অ্যান এর সঙ্গে।

টেরির নাম শুনেই আমার তিন গোয়েন্দার সেই শুটকি টেরির কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই টেরি শুটকি তো নয়ই, বরং হাসিখুশী প্রৌঢ় স্কটিশ। আমাদের প্রডাক্ট ভর্তি ট্রলি ও ড্রাইভার-দের জন্য সাজিয়ে দেয় সময় আর জোন ভাগ করে। ব্যাপক রসিক! ফুটবল ভক্ত হওয়ায় আমার সাথে জমে যায় বেশ। আমি চেলসি আর মরিনহো ভক্ত বলে কপট বিরক্তির ভঙ্গি করে টেকো মাথায় হাত বুলায়।
কিছুদিন আমাকে শেখ (উচ্চারন হয়ে যায় শিখ) বলে ডেকে শেষে রানায় এসে ঠেকেছে।

মেডোস এর রোদ ঝলমল গ্রীষ্ম

‘শিখ, ওহ সরি রানা। তোমার নাম আজ থেকে রিয়ানা’

‘তোমার নাম জন টেরি দ্যা ব্লু বেরি।’

আমার উত্তর শুনে টেরি হাসিহাসি মুখ করে বলে ওঠে,

‘হু, খেয়ে দেয়ে কাজ নেই আমি ফুটবলার জন টেরি। হলে তো আমার গাদি গাদি টাকা থাকতো। তোমাদের ট্রলি সাজাতাম নাকি। সিগার ফুঁকতাম আর কঠিন ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম।’

বলেই হান্নাহ এর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে ওঠে-

‘হান্নাহ, তোমার নাম আজ থেকে হান্নাহ দ্যা বানানা’।

ভ্যাবাচ্যাকা হান্নাহকে পেছনে রেখে আমি ট্রলি নিয়ে নতুন কাস্টমার এর জন্য প্রডাক্ট নিতে যাই। এইসব টুকরো আনন্দে আমার এক একদিন সকাল শুরু হয়।

চার.

বসন্তে এই শহর রূপের সব পসরা মেলে ধরে।

গাছে গাছে অপরূপ চেরি ফুল ফুটে থাকে। মেডোস এর অতিকায় মাঠের সরু রাস্তার দুপাশে সারি সারি চেরি ফুলের গাছ যেন শহীদ কাদরীর কবিতার মত ‘তোমাকে অভিবাদন’ বলে মনে মনে। কূর্নিশ জানায় বিনম্র। মেডোস এর অতিকায় মাঠটা দেখলেই আমার কেনো জানি দিনাজপুরের বড় মাঠের কথা মনে পড়ে যায়।

দিনাজপুর এ আমি নিয়মিত বিরতিতে যেতাম। ভালো লাগতো ছোট্ট সহজিয়া শহরটা। এখন মনে হয় কত দূরে! নাকি আমি-ই দূরে চলে গেছি!

বসন্ত চলে যেতে না যেতেই গাছের সব ফুল ঝরতে শুরু করে। রূপ-রস ভুলে গাছগুলো একেবারে ন্যাড়া হয়ে যায়। কি অদ্ভুত লাগে দেখতে। আমি কল্পনা করে নেই প্রতি বসন্তের শেষে আকাশ থেকে একজন ক্ষৌরকার আনন্দ চিত্তে মর্ত্যে নেমে আসে। এসে সব গাছের ফুল ছেটে দিয়ে যায়। দিয়েই আকাশে চলে যায়। পরবর্তি বসন্তের অপেক্ষা শুরু করে।

আর শহরের অধিবাসীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে গ্রীষ্মের।

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com