আমার একটা বিকেল ছিল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

বাবলু ভট্টাচার্য

তখন বিকেল নামতো। বিকেল মানে রেল ব্রিজের উপর দিয়ে শ্মশান ঘাঁট ছুঁয়ে যমুনার জলে সূর্যের ম্রিয়মানতার ছবি। বিকেল মানে আশুতোষ বয়েজ ক্লাবের ফুটবল। বিকেল মানে মাঞ্জা মেরে এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায় ফিল্ডিং মারতে যাওয়া। বিকেল মানে যমুনার শান বাঁধানো ঘাঁটে ঢোল কলমি গাছের ঝোপের আড়ালে বসে একটা সিগারেট নিয়ে তিন-চার জনের কাড়াকাড়ি। মাত্র দু’ঘণ্টার বিকেল।

চারটে বাজলেই স্কুল ফেরতাদের দুড়দাড় দৌঁড়। বাড়ি পৌঁছে স্কুল ড্রেস পাল্টে মুখে কিছু গুঁজে ওই সব জায়গায় ছুটে যাওয়া। হাতে মাত্র দেড় ঘন্টা সময়। বাবা-মার কড়া আদেশ সন্ধ্যারতির সঙ্গে সঙ্গেই বাড়িতে ঢুকতে হবে। ঠাকরুণতলার মন্দিরে মঙ্গলঘণ্টার সাথে সাথে আমাদের সভা ভঙ্গ হত। তারপর দৌড় দৌড় দৌড়।

ওই দেড় ঘণ্টার সময়টা ছিল আমাদের দিনের সেরা সময়। সেই ভোর না হতে বিছানা ছাড়তে হত একটু শারীরিক দৌড়ঝাঁপের জন্য। তারপর পড়তে বসা, স্কুলে যাওয়া।

আবার সন্ধে ছ’টার পরে বই নিয়ে বসা। রাত দশটায় ঘুম। বিকেলটুকুই আমাদের স্বাধীনতার একমাত্র সময়কাল।

বাড়ি আর স্কুলের মাঝখানে মরা যমুনার ক্ষীণ ধারা। নদী যখন দু’পাড় জুড়ে তখন শানবাঁধান ঘাটের সিঁড়ির উপর আড্ডা।

খেলা যখন নেই তখন সেই আড্ডায় গৌরাঙ্গ খবর দিত— ‘শেষের কবিতার লাবণ্য দুর্দান্ত’। আমরা সঙ্গে সঙ্গে লাবণ্য সম্পর্কে জানতে চাইতাম। গৌরাঙ্গ এমন ভাবে বর্ণনা করত, মনে হত রবীন্দ্রনাথের লাবণ্য ওর পাশের বাড়িতে থাকে, যাকে ধরা-ছোঁয়া যায় না কিন্তু মনে মনে জড়িয়ে নেওয়া যায়।

তখন আমাদের চোদ্দো কী পনেরো বছর। ওই বয়সেই আমরা ‘দৃষ্টিপাত’ পড়ে ফেলেছি। ওই বয়সেই বাংলা সাহিত্য হাতড়াতে গড়পাড়া পাঠাগারে গিয়েছি ভর বিকেলে। সুনীলদা পাঠাগার খুলতেন ঠিক সওয়া পাঁচটায়। আমাদের তর সইত না। ‘চরিত্রহীন’ নিয়ে প্রায় দৌঁড়ে বাড়িতে পৌঁছাতাম সন্ধ্যারতির আগেই। দরজা পার হওয়ার আগে পেটে বই গুঁজে শার্টের আড়ালে রেখে স্বামীজি হয়ে ঘরে ঢুকতাম। তারপর খানিকটা পড়া শেষ করে পাঠ্য বই-এর আড়ালে শরৎবাবু। একটা রগরগে কাহিনি পড়ার আশায় মুখ দিয়ে যখন লালা গড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায়, তখন খুব রাগ হয়েছিল। কেন শরৎচন্দ্র ‘চরিত্রহীন’ নাম রেখেছিলেন?

পরের বিকেলে যমুনার পারে বসে নেমে যাওয়া সূর্য দেখতে দেখতে আক্ষেপের কথা বলতেই গৌরাঙ্গ হেসেছিল— ‘তুই ভাল করে পড়িসনি। কিরণময়ী দিবাকরকে চুমু খেয়েছিল।’ রঞ্জন বলেছিল— ‘ফুঃ। একটা চুমু! ওই তো সূর্য পৃথিবীকে চুমু খাচ্ছে। ছেলেবেলা থেকে মা-ঠাকুমারা আমাদের কত চুমু খেয়েছে।’

গৌরাঙ্গ বলেছিল— ‘তোরা সব এক একটা ঢ্যাঁড়স। ওই লাইনটা পড়িসনি? চুমু খাওয়ার পরে কিরণময়ী ‘খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল।’ চোখ বন্ধ করেছিল সে, ‘ওই খিলখিল শব্দের জন্য আমি চরিত্রহীন হতে রাজি।’ কী দারুণ ছিল সেই সব বিকেল।

হটাৎ করেই স্কুল হোস্টেলে উঠে যেতে হল। তখন খাঁটুরা স্কুল বিল্ডিঙের গা বেয়ে দুপুরের পর বিকেল নামত। রবীন্দ্রনাথ যে বিকেলে দেখেছিলেন বৈরাগ্যের ম্লানতা, সেই বিকেলটাকেই আমি পেয়েছিলাম আমার মতো করে।

দূরের বিভিন্ন ছাদে তখন ছায়া নামত। আর গা-হাতপা ধুয়ে, পরিপাটি করে চুল বেঁধে বালিকা থেকে মধ্যবয়সিনীরা উঠে আসতেন সেখানে। বিবাহিতারা ছাদের রেলিংয়ে হাত রেখে ঝুঁকে রাস্তা দেখতেন কারও পথ চেয়ে। অবিবাহিতা তরুণীরা উদাস ভঙ্গিতে আকাশ দেখত অথবা বুঝতে না দিয়ে পাশের ছাদের কোনও তরুণকে।

হোস্টেলের ঘর থেকে সেই মরা আলোয় একটি কিশোরীকে দেখতাম। রোজ তাদের ছাদে উঠে এসে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকত। একা। তারপর অন্ধকার যখন চুঁইয়ে নামত, তখন টুক করে নেমে যেত। ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকার মানে কি প্রতীক্ষায় থাকা? জানি না।

কত বছর হয়ে গেল; অথচ মেয়েটিকে মনে আছে এখনো। এখন ভাবি ও হয়তো একা একা বিকেলটাকে উপভোগ করত।

বিকেলের শুরুটা আমার কাছে নতুন বই-এর প্রথম দিকের পৃষ্ঠার মতো মনে হত। শেষটায় খারাপ লাগত। বই ফুরিয়ে গেলে এখনও যেমন মনে হয়। বয়স যত বাড়ছে তত মনে হয় এই বিকেল না এলে রাতটাকে গ্রহণ করা খুব মুশকিল।

এক বন্ধুর বিয়ে। আমাকে তার সঙ্গী হতে হয়েছিল। জীবনে প্রথমবার। সে মেয়ে দেখতে যাবে। বন্ধু বলেছিল—

– ‘শেষ দুপুরে চলে আসবি।’

– ‘কেন?’

– ‘কনে দেখা আলোয় মেয়ে দেখব।’

সে হেসেছিল।

গেলাম। তখন সবেমাত্র সূর্য নামতে শুরু করেছে। সেই বাড়ির ছাদে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল। সেখানেই আমাদের বসার ব্যবস্থা। চমৎকার একটা আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারধারে। সেই আলোয় মাখামাখি হয়ে ভাবী কনে তার গুরুজনদের সঙ্গে ছাদে এসে দাঁড়াল। হাল্কা লালচে সোনালি রং মাখা সেই নিস্তেজ আলোয় আমার মনে হয়েছিল পৃথিবীর সেরা সুন্দরীকে দেখলাম। ঠিক যেমন দেখেছিলাম দীঘার ঝাউবনে গোধূলিতে মায়াময় হয়ে ওঠা পৃথিবীকে।

দেশে ফিরেই বিদেশে পাড়ি জমালাম। কিন্তু সেখানে, সকাল আছে, দুপুর নেই, বিকেল নেই। সারা দিন নিস্তেজ আলোয় কাটিয়ে ঝুপ করে সন্ধ্যার অন্ধকারে ডুবে যেত পৃথিবী। একটুও ভাল লাগেনি। যখন কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম ধীরে ধীরে, কাজ শেষ করে বাইরে পা দিতেই চারধারে বিদ্যুতের আলো। কখন বিকেল চলে গিয়েছে। তাকে আঁকড়াতে চাইতাম ছুটির দিনে।

সেই বিকেলের মৃত্যু হয়ে গেছে অজান্তেই। কাজ, কাজ এবং কাজ। সারা দিন সারা সন্ধ্যা কাজ করে বাড়ি ফেরার পথে শাহবাগের কোন রেস্টুরেন্টে ঢুঁ মারতে রাত ন’টা বেজে যায়।

সারা দিন স্কুল-কলেজ সেরে পড়তে বসে যে সব ছেলেমেয়ে, তারা ছুটি পায় রাত-গভীরে। তখন ল্যাপটপ খুলে বন্ধুদের সঙ্গে ‘চ্যাট’ করার সময়। ফেসবুক, ব্লগ, টুইট, হোয়াটস্অ্যাপ— পৃথিবী তখন হাতের মুঠোয়।

যে বিকেলটা আমাদের ছিল তা এদের হয় মধ্যরাতে। সূর্য ডুবে গেলে যে বিকেল আমাদের শেষ হয়ে যেত, ইচ্ছে থাকলেও হনুমান হয়ে সূর্যটাকে বগলে আটকে রাখতে পারতাম না, তা এরা নিজেদের ইচ্ছে মতো শেষ করে। কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়েই আবার ছোটাছুটি শুরু।

বিদেশে জন্ম নেয়া আমার বোনের ছেলে প্রশ্ন করেছিল— ‘আচ্ছা মামা, এই ধানগাছে কাঠ হয়? হয় না! তাহলে গাছ বলা হয় কেন?’

হয়তো কিছু বছর পরে প্রশ্ন শুনব— ‘আচ্ছা, বিকেল মানে কী? ওটা তো দিনের অংশ, তাহলে তা নিয়ে এত কাব্য কেন?’

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com