আমার আর মিশুর একদিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেখ রানা (এডিনবরা,স্কটল্যান্ড থেকে)

এক.

ডিন ভিলেজ গিয়েছিলাম আজ।

প্রিন্স স্ট্রিট থেকে অনতিদূরে এত চমৎকার একটা জায়গায় আগে কেন যাইনি সেটা ভেবে আমি আর মিশু দুজনেই বিস্মিত হলাম। শহরের ভেতর সত্যিকার অর্থেই এক টুকরো অতীত। বিল্ডিংগুলোর স্থাপত্যকলা শহরের সাথে কোনোভাবেই মেলে না। একটার দেয়ালে দেখি খোদাই করে ১৬৫৭ লেখা। এত পুরোনো!

ওয়াটার অফ লিথ এর গা ঘেঁসে ডিন ভিলেজ খুব নিস্তরঙ্গ। কোলাহোল নেই, উচ্চকিত আওয়াজ নেই। ক্যামেরা কাঁধে আনন্দমুখে পর্যটকের হেঁটে যাওয়া আর ঝর্নার নিজের উপস্থিতি জানান দেয়া সশব্দে। এতটুকুই।

দুই.

কাল বেথ এসেছিল।

আমার রুল টানা খাতা বই এর আর এক চরিত্র। প্রিন্সেস স্ট্রিট আর বাংলায় কথা বলা বেথ-অংশে ওর কথা আছে। ওকে বলতেই শিশুর মত খুশী হয়ে উঠলো। আগ্রহ করে জানতে চাইলো বইটা নিতে পারবে কিনা।

বেথ একটা সুন্দর বই উপহার দিয়েছে আমাদের। বাংলায় তর্জমা করলে দাঁড়ায়- এডিনবরায় যে ১১১ জায়গা কোনোভাবেই মিস করা যাবে না। আমরা আজ থেকে সেই বই এ লেখা জায়গা, যেগুলো এখনও দেখা হয়নি-দেখতে বেরিয়েছি। শুরু হলো ডিন ভিলেজ দিয়ে।

ডিন ভিলেজ একসময় ব্ল্যাক স্মিথ আর ময়দা দিয়ে নানাজাতের খাবার বানানো কারিগরদের পদচারনায় মুখর থাকতো। ডিন ব্রিজ হবার পরে ধীরে ধীরে পুরোনো কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে বসতি গড়ে ওঠে।

তিন.

ডিন ভিলেজ থেকে হেঁটে মিনিট দশেক গেলেই স্কটিশ ন্যাশনাল গ্যালারী অফ মডান আর্ট।

আমরা দ্রুত পায়ে সেখানে যাই। ভিতরে ঢুকতেই সবুজ এর আড়ত। ইউরোপ থেকে আগত স্কুল এর এক দঙ্গল বাচ্চা-কাচ্চার কোলাহল কানে এসে লাগে। সম্ভবত শিক্ষা সফরে এসেছে। কান পেতে বোঝার চেষ্টা করি কোন ভাষায় কথা বলছে। ধরতে পারিনা।

মিশু বসে স্কেচ করতে শুরু করে। দারুণ রোদ চারিদিকে। আমার কেন যেন মনে হয় বৃষ্টি শুরু হবে। মিশুকে বলতে না বলতেই বৃষ্টি পড়া শুরু হয় দু-এক ফোঁটা। সবাই হাসিমুখে দৌড়ে গ্যালারীর প্রবেশমুখে আশ্রয় নেয়।

আজ আর গ্যালারী ঘুরে দেখা হয়না আমাদের। ফিরে আসার ফিরতি

বাস ধরি।

চার.

মাঝ পথে ফাউন্টেন পার্কে নেমে পড়ি। সেখান থেকে হেঁটে হেঁটে কস্তুরিতে যাই।

আজ দুজন ঠিক করেছি রেস্টুরেন্ট এর খাবার খাবো। ‘একটা দিনের জন্য সব উল্টোপাল্টা হোক-গোছের কিছু। কিন্তু সে রকম কিছুই হবে না জানি। টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে শহরে। আমার হুডি জ্যাকেটটা নষ্ট হয়ে গেছে। কিছুদিন ধরে কাশি যাচ্ছে না।

আচ্ছা, বাঁশী বাজালে বাশুরিয়া, কাশি হলে তাকে কি কাশুরিয়া বলা যাবে! মিশুকে বলতেই উচ্চশব্দে হেসে ওঠে।

কস্তরিতে ঢুকে জুয়েল ভাই এর সঙ্গে দেখা হয়। টেবিলে বসে খাবার অর্ডার দিয়েই শুনতে পাই পার্থদা গান গাইছে। ‘তোমার এই মনটাকে একটা ধূলোমাখা পথ করে দাও’…সকাল এর লেখা, বাসুদার সুর। সকাল ছেলেটা কোথায় গেল! এত বিনয়ী আর সরল একটা ছেলে। কি সুন্দর একটা লিরিক এর গান। অনেক আগে, ২০০২-০৩ এর দিকে বাসু’দার বাসায় পরিচয় হয়েছিল ওর সঙ্গে, মনে পড়ে।

এই বিদেশ বিভুইয়ে চারপাশে স্কটিশ মানুষজন এর প্রায় দূর্বোধ্য আলাপচারিতার আবহে পার্থদার গান-দারুণ লাগে আমার।

এখন গান বাজছে-আজ তোমাকে প্রয়োজন।

পাঁচ.

এডিনবরায় আমাদের চার বছরের ইতি ঘটতে যাচ্ছে।

ইতিপূর্বে একটা ভালোবাসার সেতুবন্ধন তৈরি হয়ে গেছে। এই শহরের সঙ্গে। ছেড়ে যেতে থমকে যেতে হবে অনুপল।

এই শহরের পথ, গলি, মানুষ, রবিবার এর ব্যডমিন্টন খেলা, লোদিয়ান বাস, স্টারবাকস কফি শপে বসে লেখা, নিকলসন স্ট্রিট -সব মিলে মিশে একাকার হয়ে আত্মায় ঢুকে গেছে আমার।

আত্মা-র কতটুকু পরিসর? এত অযুত অনুভূতি কিভাবে ধরে রাখে সে!

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com