আমাদের সেই শিউলি গাছ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দেবপ্রিয়া রায়

(কলকাতা থেকে): সিঁড়ির ঘরের পশ্চিমদিকের যে জানলাটায় কোনো শিক ছিলনা, সেই জানলাটার বাইরে একটা ছোট্ট ঝুল বারান্দা আছে।তার পাশেই,ঠিক পাশেই একটা ঝুপড়ি শিউলি গাছ ছিল।গ্রীষ্মের দুপুরে যখন মা নীচে ঘুমাতো…আমি পা টিপে টিপে বারান্দাটাই আসতাম।কাবুও আসতো। আমরা তখনও ‘বলাই’ পড়িনি।কাবু তখন ৭। কাবু গাছের ছায়ায় পাখি ঘর আরোও কত কী দেখতে পেতো। আমি তখনও ওর চোখ দিয়ে দেখি,বুঝি,ভাবি। পাতা ভেঙ্গে গন্ধ শুঁকতে গেলে কাবু ভারী বিরক্ত হত। আমি জ্যামিতি খাতা ছড়িয়ে বসে সরলরেখা আঁকতাম।কাবু তখন ১১। কাবু বড়ো ভালো সরলরেখা আঁকতো। কী আশ্চর্য,এখন কাবুর দৃষ্টানুপাতটাই বেঁকে গেছে। তারপর বিকেল হলুদ হতো,দূরে থেকে সুর আসতো….’ভৈরবী’,’মধুবন্তী’বা ‘শ্রী’!কাবু কোল ঘেঁষে বসতো আমার। সরিয়ে দিলে কাবুর ফুলো ফুলো গাল তখন টলোটলো চোখে অভিমান মাপতো। কাবুর গালে আর হাত ছোঁয়ানো যায়না। কাবু এখন অনেক লম্বা।কাবু এখন ১৮,কাবু এখন মোটা মোটা বই নিজেই পড়তে পারে। শিউলি গাছটা কেটে ফেলা হয়েছে। কাবু প্রেমিক হতে পারেনি। কাবুর গার্লফ্রেন্ড ভারী মিষ্টি দেখতে। কাবু এখন পালিশ করা,কাঁচের মতো ঝকঝকে। কাবু আর আসে না। কাবু বেলি ফুলের গন্ধ ভুলে গেছে। কাবুর দেওয়া মাটির সরার জলের উপর আমি রোজ ভাসিয়ে রাখি বেল ফুল,এখনোও! কাবু আর রুমাল নাই, বিড়ালে ভারী ভয় কাবুর। আজ কাবু চৌকাঠে পা রেখেছে। কাঠের ছোট্ট পড়ার চৌকি,কাগজফুলের গাছ, ‘চোখের বালি’, একটা মাদুর, গ্র্যান্ডফাদার ক্লক…কাবু জানেনা সাত বছরে তৈরী হওয়া সাত আলোকবর্ষের দূরত্ব মুছতে। এখন বিকেল। রোদবাবু ঘরে ফেরার আগে টেরচা চোখে কাবুকে একবার দেখলো।জানলাটাই এখন গ্রিল বসানো। ছায়ারা ছবি হচ্ছে কাবুর গালে,মনেও। কাবু এখন ২৩…কাবু এখন পুরুষ! কাবু আর সবুজ নয়। এ কী, কাবু কাঁদছে কেন…! কাঁদাটা জরুরী, হাতের উপর হাত রাখাটাও!কাবুরা ভেসে যায়,ফিরেও আসে। শুধু হাতটাই আলগোছে কোলের উপর পড়ে থাকে, অপ্রেমেও!

পুনশ্চঃ আমাদের সেই মরে যাওয়া শিউলি গাছে টুনটুনি বাসা বেঁধেছিল,কাবু একখানা ছবিও তুলেছিল তার।কাবু ফিরলো। টুনটুনি আর তার ছানা আর ফিরবে না,ছবিটা আমার ডায়েরীতে রাখা আছে!

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com