আমাদের রোজাগুলো

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

কনকচাঁপা যতদুর মনে পড়ে খুব ছোট বয়সেই আমি রোজা থাকা শুরু করি।এতো ছোট যে আমাকে দেখা যায়না আমার রোজা দেখা যায়।একটা রোজা থাকার পর সবাই ভাবতো দুপুর হলেই ছেড়ে দেবে,কিন্তু সেই ভাবনা যখন সত্যি হতো না তখন সবাই অস্থির হতো।নানারকম কানপড়া দিয়ে বলতো,বাচ্চাদের রোজা তো দুপুরেই ভাঙতে হয়,বাচ্চারা দিনে পাঁচটা রোজা রাখে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি এই ছেলেভুলানো কথার বান্দা কখনওই ছিলাম না।এগুলো কথায় কান কখনওই দিতাম না,আর একজন মানুষ ও কিছুই বলতেন না,তিনি আমার মা।মা জানতেন এই জিদ্দি মেয়ে ঠিকই পারবে।এক এক বার পাঁচ ছয়টা রোজা রাখতাম।এর পর আব্বা সত্যি রেগে গিয়ে রোজা রাখতে দিতেন না।হয়তো সাতাশের রোজাটা রাখতাম।তো একবার ভীষন লম্বা দিন ও গরম পড়লো। কোন এক রোজার বিকেলে আম্মা জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। কি অবস্থা! আমার অবস্থা ভীষন খারাপ।স্কুল বন্ধ,কিন্তু এক জায়গায় কজন বান্ধবী একত্রিত হয়ে পড়ি।কেউ একজন বললো সে নাকি পানি পিপাসা পেলে একটা খালি কাঁচের বোতলে রোজা জমা রেখে পানি খেয়ে আবার রোজা নাকে টেনে নিয়ে নেয়।আমি ভাবলাম ভালোই তো।একটা বোতল পরিষ্কার করলাম।আমার স্কুল ব্যাগ এ বোতল রাখা।কয়দিন দিব্বি বোতলে রেখে পানি খেয়ে রোজা আছি।গরমে সবাই যেখানে অস্থির আমাকে সেখানে মৌন মুনি ঋষি দেখে আম্মা ধরে ফেললেন ব্যাপারটা।আমি কিন্তু ফাঁকি দিচ্ছিলাম না।কিন্তু আম্মা তা মানলেন না,ঠিকই কিছু কিল গুষি দিলেন এবং রোজার সত্যি নিয়ম গুলো খাতা কলমে বুঝিয়ে দিলেন।

তারপর থেকেই শুরু হল সত্যসাধন, আত্মশুদ্ধি। রোজাকে ভালবেসে ফেললাম।রোজার খুঁটিনাটি বুঝে গেলাম। আমাদের সময়ে এতো কেনা ইফতার এর চল ছিল না।মার হাতের চমৎকার ইফতারিই খুশী মনে নেয়ামত হিসেবে খেতাম।সারাদিন কতকিছুই না জমিয়ে রাখতাম ইফতারিতে খাবো বলে।ইফতার করে আর সেগুলো খাওয়া হতোনা।ইফতারের ওয়াক্তে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে বাড়ির উঠানে এসে হাঁক ছাড়তো — মাগো ইস্তারী দিবেন।এই ইস্তারী শব্দটি শুধরে দিতে কত চেষ্টা করেছি আমি,পারিইনি।ভোররাত এ সেহরি খেতে উঠে সবসময় দেখতাম একটা উৎসব এর আমেজ।সেহরি শেষে আব্বা আব্বা দাদী মা চা খেতেন।সে চায়ের গন্ধে এতক্ষণ চোখে আঠার মত লেগে থাকা ঘুম উধাও হত।কি দারুন সেই এরোমা, এখনো সেই এরোমা তেমনি আছে কিন্তু আমেজ? তাকে তো আর পাইনা।রোজার শেষের দিকে আর রোজায় মন বসতো না।মন পড়ে থাকতো ঈদের জামা,ঈদ ভাবনা , মেহেদী আঁকা ঘর গোছানো ইত্যাদি ব্যাপারে।কিন্তু শেষের দিকেই ক্কদর রাত খুঁজতে বেশী মনযোগী হতে হতো।এভাবেই কেটে যেতো এক এক বছরের রোজা,ঈদ,সময়। এই সব কঠিন অনুশাসন এর মাঝেই ধীরে ধীরে আমি বেড়ে উঠলাম।আমার জীবন, আমার পরিবার, আমার সংস্কার, আমার অনুশাসন, আমার ধর্ম নিয়ে আমি আসলে খুবই গর্বিত। আলহামদুলিল্লাহ।

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com