আমাদের ছিলো বাঁধনহারা দিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী

১৯৮৬ থেকে ১৯৮৭ এর মধ্যে কোনো একটা সময় আমার বয়স ৮/৯। আমার বাবা তখন যশোর, রাজ টেক্সটাইল মিলের মহা ব্যবস্থাপক। যশোর- খুলনা মহাসড়কের ধারে এক অজ পাড়া গাঁয়ে মিলের কম্পাউ

কিংবদন্তি শিল্পী কণিকা বন্দোপাধ্যয় ও আমি

ন্ড। তা হলেও গাড়ি,ড্রাইভার, সর্বক্ষণ পিয়ন, দারোয়ান, মালির কোনও অভাব নেই। বাউণ্ডারি ঘেরা বিশাল এলাকা। সাদা ধবধবে ডুপ্লেক্স দোতলা বাংলো। আমার আব্বু সেখানে বাড়ির চারধারে গোলাপ, শিউলি, হাস্নাহেনা,বাগান বিলাস, কসমস, ডালিয়া, বটলব্রাশ, গাঁদা,জবা সহ আরো নানান ফুলে ছেয়ে ফেললো।রান্নাঘরের পেছনে করা হলো সবজি বাগান। বেগুন,আলু,শসা,টমেটো, ধনে পাতা, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, শিম, গাজর,পালং শাক, ফুলকপি, পিঁয়াজ, কাঁচা মরিচ – সবই বাগান থেকে আসে। সালাদ বানাতে হলে টাটকা সবজি বাগান থেকে আনতাম আমরা। আমার মেজো বোন রত্নেশ্বরী ছুরি হাতে তরমুজ ক্ষেতে বসে পড়তো তরমুজ খাওয়ার জন্য। পুকুরে ছাড়া হলো

তেলাপিয়া, গলদা চিংড়ি। এছাড়া, আম, জাম,ডাব, পেয়ারা এসবের তো ছড়াছড়ি। হাঁস মুরগির কবুতরের জন্য চিড়িয়াখানার মতো বিশাল বড় খাঁচা। সারাদিন বাইরে বাইরে থাকে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আসে তারা।ছিলো খরগোশের ঘরও।আমাদের ছোট্ট পাপ্পি বান্টিও ছিলো।আমাদের তিন বোনের ছিলো বাঁধনহারা দিন। রিয়া- টুম্পা, রিপন ভাই, রমু ভাই,শ্রাবণীর সঙ্গে ব্যাডমিন্টন, গোল্লাছুট, বুড়িচ্চি খেলা,দোলনা চড়া, পুতুল খেলা,বাকী সময় নেশার মতো সাইকেল চালাতাম মিলের এ মাথা ও মাথা।

মোহর দি, গোরা সর্বাধিকারী আর আমি।

আমরা যাওয়ার আগে বিরান ছিলো জায়গাটা।আব্বু -আম্মুর স্পর্শ পেয়ে যেন স্বর্গ হয়ে উঠেছিল সবকিছু। আম্মুর ঘর সাজানো, বিকেলে বাগানে বসে চা খাওয়া, বারন্দায় বসে রেল লাইনের ওপারে যতদূর চোখ যায় অবারিত সবুজ ধানক্ষেত দেখা, মহাকাল রেলগেটের সেই কাঁচাগোল্লা,ছানার জিলাপি, গরুর টাটকা দুধ আর ঘোল, নতুন গুড়ের পায়েস, আব্বুর সঙ্গে লং ড্রাইভে রবীন্দ্রসংগীত, ডন উইলিয়ামস, ABBA-র গান শোনা.. সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি।মিলের পেছনে বুড়ি ভৈরব নদীর ওপারে ঘুঘু ডাকা দিয়াপাড়া গ্রাম। সেখানে মাটির ঘর সযত্নে লেপে রাখে, ঢেঁকিতে ধান ভানে বাড়ির বউঝিরা। জীবন এখানে ঘাস ফড়িঙ আর প্রজাপতির মতো নির্ভার..
আমাদের এই অজপাড়া গাঁয়ের বাড়িটি তে তখন ঢাকা আর কলকাতা থেকে অনেক গুণী মানুষের আসা যাওয়া ছিলো। বড় নানা (আমার মায়ের বড় মামা) নাজিম মাহমুদের সূত্রে কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতি অংগনের বহু স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বর সান্নিধ্য আমরা পেয়েছিলাম এই বাড়িটিতে।একবার শান্তি নিকেতন থেকে দিন কয়েকের জন্য এলেন কণিকা বন্দোপাধ্যয়, গোরা সর্বাধিকারী। সঙ্গে ঢাকা থেকে সনজীদা খাতুন, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। এক সন্ধ্যায় গানের আসর বসলো।কিছু না বুঝেই হারমোনিয়ামে আমি সবার আগে বসে পড়লাম!!! আমার তখনো এতোটুকু জ্ঞান হয়নি যে মানুষটির পায়ের কাছে বসে আমি গান গাইছি তিনি কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়!! সবার মোহর দি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের দেয়া নাম।কবিগুরুর পরম স্নেহের, সরাসরি ছাত্রী।তাঁরই সামনে আমি গাইলাম, “গানের ভেলায় বেলা অবেলায়”… গান শেষ হলে তিনি বলেছিলেন, ওর দিকে তোমরা খেয়াল রেখো, বড় হয়ে ও আরেক কণিকা হবে।.. তারপর আমাকে কাছে নিয়ে ছবিও তুলেছিলেন… আমার আর নিজের প্রতি খেয়াল রাখা হয়নি। গান গাওয়াটাও ধরে রাখা হয়নি…একজন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় শত বছরে একবারই জন্ম নেন।কবিগুরুর প্রয়াণ দিবসে মোহর দি কে প্রণতি।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com