আবার একবার বাবা-মা’রই মেয়ে হতে চাইবো

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রিনি বিশ্বাস,সঞ্চালক ও বাচিক শিল্পী

সেভাবে দেখতে গেলে রিনুকে মোটের উপর অবাধ্য মেয়ে বলা যাবেনা! ছোট থেকেই বাবা-মায়ের কথা একরকম মেনে চলারই চেষ্টা করেছে সে! কবে থেকে যে ‘এটা করতে হয়’ আর ‘ওটা নয়’ জানা হয়ে গেছিল, রিনু বলতে পারবেনা! তবে আগের কথা মনে পড়লে রিনু দেখে- কোনটা কখন করতে হয় বা হবে, তা রিনু জানতো! জানতো মানে নিশ্চয়ই মা-বাবাই শিখিয়েছিলেন! সেটা কবে-বেমালুম ভুলে গেছে এখন! যাক গে, তা অবশ্য তেমন জরুরিও নয়! মা বাবা তো দুজনেই সারাদিন বাইরে; ব্যস্ত জীবন তাঁদের.. একদম ছোটবেলা মানেই রিনু আর রিনুর পিসি.. পিসিও কোনদিন বকুনি দিয়েছে বলে তো মনে পড়েনা! যেমন মনে পড়েনা কোনদিন ‘পড়তে বোস’ বা ‘কাল না তোর পরীক্ষা’ বলে বকুনি দিয়েছে মা বা বাবা! বরং পরের সপ্তাহে উচ্চমাধ্যমিক শুরু, মেয়ে পড়ার বই না পড়ে ‘ ন হন্যতে’ পড়ছে দেখেও বাবা কিস্যু বলেননি! কত ভোরবেলা মা ঘরে আলো জ্বলতে দেখে উঁকি দিয়ে বলেছে ‘কি রে ঘুমোসনি?’ উল্টোটা, মানে ‘কি রে, কত ঘুমোবি? পড়বি না?’ মা-বাবাকে এমন বলতে কোনদিন শোনেনি রিনু! রিনুর মা বাবা চিরকালই অন্য মা বাবাদের থেকে খানিকটা আলাদা! খড়গপুরে মাসিমণির বাড়ি যাচ্ছে রিনুরা;সম্ভবত বড়দিভাইয়ের বিয়ে; কারণ তখন রিনু বেশ ছোট; ছবিটা বেশ ফিকে…সঙ্গে বোধহয় সেবার কাঞ্চনমামা ছিল; কি নিয়ে গল্প হাসিঠাট্টা চলছে.. বাবা প্রায় অ্যানাউন্সমেন্টের ঢঙে বলেছিলেন ‘আমি আমার মেয়ের বিয়ে দেবোনা, ও নিজে বিয়ে করবে!’ তখন বিন্দু বিসর্গ না বুঝলেও পরে রিনু বুঝেছিল কথাটার মধ্যে কি পরিমাণ সন্তানের উপর বিশ্বাস লুকোনো ছিল…সন্তানের উপর কিছু চাপিয়ে দেওয়ায় তিনি কোনদিন বিশ্বাসী নন… জীবন সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রেই বা তার অন্যথা হয় কি করে! রিনুর জন্মের ছ’মাস পরে-পিসির বিয়ের পরদিন বাবার হাপুস কান্না দেখে যখন মেজ জেঠিমা বলেছিলেন ‘তোমারও তো মেয়ে; তার বিয়ে হলে কি করবে!’ তখন বাবার উত্তর ছিল ‘মেয়েকে বিয়েই দেবোনা!’ …. দুটো ঘটনার প্রেক্ষিত যদিও একদম আলাদা কিন্তু যতবার তা মনে পড়ে রিনুর মনটা বাবার জন্য ভিজে ওঠে… রিনুর মা খুব রাগী; খুব মানে সত্যিই খুব! রিনুই শুধু নয়, রিনুর বন্ধুরাও ভয় পায় তাঁকে! কি মিঠে গলা তাঁর; রবি ঠাকুর সবসময় তাঁর প্রাণে, কন্ঠে…সেই তিনি যে কি করে অমন বকুনি দিতেন! আড়ালে ঠোঁট ফুলিয়ে রিনু ভাবতো ‘ নির্ঘাত রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনা হয়েছে’ তাকে… নাহলে এমন বকবে কেন মা!!! কি নিয়ে বকুনি? অজস্র কারণ ছিল! যেমন বিকেলে খাবার পরে টেবিল মুছে হয়ত বা ডাস্টারটা না ধুয়েই রিনু রেখে দিয়েছে! অফিস থেকে বাড়ি ঢুকেই কি এক যাদুবলে মা তা টের পেত! ব্যস্, বকুনি! রান্নাঘরে ঢোকা একদম বারণ ছিল রিনুর; যত কষ্টই হোক, সব কাজ মা করে তবে অফিসে বেরোতেন! হয়ত টুকিটাকি কিছু করতে বলেছেন রিনুকে, এবং রিনু ‘ঢিকিস ঢিকিস’ করে দেরি করেছে! অতএব বকুনি! ভাইয়ের সঙ্গে খিটিমিটি মানেও রিনুর কপালেই বকুনি! রিনু বড়, ভাইকে তো ওরই দেখে রাখা উচিৎ! পড়ার টেবিল গোছানোয় গাফিলতি, দুধ খেতে গিয়ে সর পড়েছে বলা, এমন আরো কত হাজারো কারণ আছে বকুনির ! বিয়ের পরে বরের সঙ্গে কোথায় যেন গেছে রিনু; সেদিন মা বাবার কাছেই রাতে থাকার কথা; একটু বোধহয় দেরি হয়েছিল ফিরতে! বেল বাজানোর পরে দরজা খুলতে যা দেরি, ল্যান্ডিং থেকে কি জোর বকুনি দিয়েছিল মা! জামাতাসহ কন্যা ভয়ে জড়োসরো! এহেন মাও কিন্তু রিনুকে অভব্য আচরণ বা পড়াশুনোয় অমনোযোগ নিয়ে বকাবকি করেননি কখনও! প্রথমটা হয়ত দরকার পড়েনি আর পরেরটাকে সম্ভবত রিনুর মা বাবা তেমন গুরুত্ব দিতেন না! কোনদিন রিনুকে বলা হয়নি ‘ইস্ আর দুটো নম্বর পেলিনা!’ বা ‘কেন এবার একটা পজিশন পিছিয়ে গেলি’!!! রিনু কিভাবে যেন জানতো মোটামুটি ভদ্রস্থ লেখাপড়া করলেই চলবে… আর শুধুই পড়ার বই পড়লে চলবেনা… এম এ ক্লাস চলছে তখন। বন্ধুরা সবাই ব্যাঙ্কিং এর পরীক্ষা নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছে! রিনুর মত গয়ং গচ্ছ তার কোন বন্ধুই নয়, সবাই দস্তুরমত সিরিয়াস এবং প্রত্যেকেই এখন জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত! বাবা যেহেতু ব্যাঙ্কে চাকরি করেন তাই সবার ধারনা ছিল রিনু বিষয়টা বেশি ভালো জানবে! একদিন বাড়ি ফিরে বাবাইকে একথা বলাতে বাবাই বলেছিলেন ‘কে বলেছে চাকরির পরীক্ষা দিতেই হবে বলে তুই এম এ পড়ছিস! পড়ার জন্যই পড়; চাকরি পরে হবে!’ মা তো আরো ভালো; ছোটবেলা থেকেই বলেছেন ‘নাহ্, চাকরি করার দরকার নেই!’ নিজে সারাজীবন চাকরি করেছেন অথচ চাননি মেয়ে দশটা পাঁচটার সেই জীবনটাই পাক- যেখানে ঘরে বাইরে উদয়াস্ত পরিশ্রমের পরেও বিবেক দংশন পিছু ছাড়বেনা কখনও!তবে কি তিনি চাইতেন না নিজের পায়ে দাঁড়াক মেয়ে? সবসময় রিনু মাকে বলতে শুনেছে স্কুলে বা কলেজে পড়ানোর কাজ হলে ঠিক আছে নাহলে অন্য চাকরি করার দরকার নেই! বাবা জোর করেননি কিন্তু কথাবার্তায় টের পেত রিনু-তিনি চান মেয়ে অধ্যাপনা করুক বা সিভিল সার্ভিসে যাক! মুসৌরি বেড়াতে গিয়ে আই এ এস ট্রেনিং সেন্টার দেখিয়েছিলেন; বিশ্বাসবাড়ির কেউই সিভিল সার্ভিস জয়েন না করাতে তিনি খুবই দুঃখ পেয়েছেন! রিনু বরাবরই লতানো গোত্রের! কারুর উপর নির্ভর করতে না পারলে তার চলেনা; সম্পূর্ণ নির্ভর এখন আর সে করেনা, কিন্তু একা-সিদ্ধান্ত নিতে সে এই মধ্যবয়সেও দড় না! নিজের মত অনুযায়ীই কাজটা রিনু করবে, কিন্তু আর কাউকে দরকার যে বলে দেবে ‘এই তো বেশ হল’… পলায়ন মনোবৃত্তি কি?! না দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা?! মাধ্যমিকের পর কি নিয়ে পড়বে, মা ঠিক করে দিল; রিনুর বক্তব্য নেই; সে রাজি; উচ্চমাধ্যমিকের পর কি নিয়ে পড়বে মা ঠিক করলো; রিনু তাতেও রাজি; শুধু মায়ের স্কুলে পড়ার পর তার মনের সুপ্ত বাসনা ছিল মায়েরই কলেজে ভর্তি হবার- যাতে মা সায় দেননি! ‘প্রেসিডেন্সিতে ভর্তি হলে মেয়ে ক্লাস না করে কফি হাউসে আড্ডা দিয়েই সময় কাটাবে কেবল’ সুতরাং নৈব নৈব চ! রীতিমত ভর্তির পরীক্ষা পাশ করার পরেও মায়ের কলেজে রিনুর পড়ার সাধ মেটেনি! মায়ের ইচ্ছেতেই রিনুর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া… এই অবধি ঠিকই ছিল; গোল বাঁধলো পরে… মেয়ে যতই কথার বাধ্য হোক, তার যে অনড় একগুঁয়ে জেদ বড়ই সাংঘাতিক- তা টের পেলেন রিনুর মা বাবা আরো কয়েকবছর পরে যখন মোটামুটি স্থির হওয়া বিয়ে- ‘করবোনা’ বলে রিনু বেঁকে বসলো…সে এক অন্য মহাভারত.. অন্য প্রসঙ্গ! এরপরেও রিনুর জীবনের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া যাবতীয় ঝড়ঝাপটা – বারবারই জানান দিয়েছে তার জেদ কি মারাত্মক! বর্তমানে বাবা মা কন্যা- সবার বয়স এবং ভূমিকাতে কিঞ্চিৎ বদল এসেছে; রিনুর মা বাবা এখন মানসিকভাবে অনেকাংশে নির্ভর করেন তাঁদের কন্যার উপর; তবে রিনুর সেই শুরুর দিনের নির্ভরতা আজও কমেনা… কোন কিছু বাবা মাকে না জানানো পর্যন্ত আজও রিনু স্বস্তি পায়না… যতই বর বলুক ‘ধারাবিবরনী দেবার মত করে ২৪ ঘন্টার সব কথা মাম্মামের সঙ্গে ফোনে বলিস কি করে!’ তবু রিনু তাই করে… তাই-ই করতে চায় আমৃত্যু…কালও সকালে উঠেই কাজের ফাঁকে রিনু আবার ফুরসত খুঁজবে মাকে ফোন করার… বাবার গলা শোনার…আবার একবার ‘তাঁদের’ মেয়ে হতে চেষ্টা করবে রিনু, যাঁদের জন্য তার অস্তিত্ব-যাঁরা তার অস্তিত্ব…

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com