আন্দামানের সেলুলার কারাগার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান, সিনিয়ার সংবাদিক

(কলকাতা থেকে): আন্দামান যাবার সাধ ছিল অনেকদিনের। একটু দ্বিধাও ছিল, কারণ সেখানে যেতে বিদেশীদের অনুমতি লাগে। তবে পরে জানলাম এই অনুমতি বিমান বন্দরে ‘অন অ্যারাইভাল’ দেওয়া হয়। ফলে আমার আন্দামান

ফাঁসির দড়ি

যাবার সাধ পূর্ণ হল। পোর্ট ব্লেয়ার সেখানকার বড় শহর। সেখানে আপনার মনেই হবে না যে, আপনি চারদিকে সমুদ্র ঘেরা কোন দ্বীপে আছেন। সেখানে তিন ভাষাভাষী মানুষের সহাবস্থান রয়েছে – বাঙালি, তামিল ও কিছু তেলেগু। আন্দামানে বিমান ছাড়া জাহাজে যাওয়া যায়, যা ছাড়ে ভারতের মাত্র তিনটি বন্দর থেকে – কলকাতা, চেন্নাই ও বিশাখাপতনম, যার ইংরেজী নাম ভাইজাগ। এই ইউনিয়ন টেরিটরি কলকাতা থেকে ১২৫৫ কিলোমিটার দূরে এবং পোর্ট ব্লেয়ার এর একমাত্র শহর। এই দ্বীপপুঞ্জে ৩২১টি দ্বীপ আছে। অবশ্য সবগুলোতে জনবসতি নেই। এর প্রথম উল্লেখ সম্ভবতঃ পাওয়া যায় কাশ্মীরি কবি ক্ষেমেন্দ্রে’র লেখায়। মার্কো পোলো ১২৯০ সালে আন্দামানকে সুদীর্ঘ দ্বীপ বলে উল্লেখ করেন। এমনকি সম্রাট অশোকের কাছে একদল বণিক আন্দামানে ‘কৃষ্ণাঙ্গ অ-সভ্য উপজাতি’র হামলার ব্যাপারে অভিযোগ জানিয়েছিল বলে জানা যায়। এখানে উল্লেখ্য, সংখ্যা কমে গেলেও, এখনো বেশ কিছু আদিবাসী আন্দামানে আছে। কিছুদিন আগেও তাদের মধ্যে জারোয়াদের দেখতে যেতো পর্যটকরা। কিন্তু ভারত সরকার এই অমানবিক প্রথা নিষিদ্ধি ঘোষণা করেছে।
আন্দামানে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের যেমন নেওয়া হতো, তেমনি দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে আগত ছিন্নমূল উদ্বাস্তুদেও পুনর্বাসন করা হয়। ফলে সেখানকার বাঙালিরা কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গেও কোন আঞ্চলিক ভাষায় নয়, খুলনা-যশোরসহ বাংলাদেশের নানা অঞ্চলের ভাষায় কথা বলে। তবে তারা জানে না, তারা কোথা থেকে এসেছে। তাদের অধিকাংশের, এমনকি তাদের মা-বাবারও জন্ম আন্দামানে। একটু আগেই যেমন বললাম, ব্রিটিশ-বিরোধী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আন্দামানে নেওয়া হতো। সেটা ছিল তাঁদের কঠোরতম শাস্তি – কালাপানি। মজার কথা, এখানকার সমুদ্রের অনেক রঙ, তার মধ্যে কালচে নীল অন্যতম।

তেল বানাবার যন্ত্র

আকাশ মেঘলা থাকলে সেই পানিকে কালই মনে হয়। যাহোক, এসব বন্দীদের যেখানে রাখা হতো, আজ আমি সেই সেলুলার কারাগারের কথাই বলবো।
ভারত থেকে প্রথম ব্যাচের মুক্তিসংগ্রামীরা আন্দামানে এসে পৌঁছে ১৮৫৮ সালের ১০ই মার্চ। তাঁরা মৃত্যুদন্ড থেকে অব্যহতি পেয়ে পিনাল সেটলমেন্ট’এ জীবনের বাকী সময় কাটাবার জন্য আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে গিয়ে পৌঁছে। তাঁদের বয়স ছিল ১৮ থেকে ৪০ বছর। তাঁদের কালাপানি পার হবার দন্ড বা নির্বাসন দেওয়া হয়। তাঁরা গিয়েছিলেন ভারত ও বর্মা থেকে। কালাপানির অর্থ ছিল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে নিষ্ঠুর নির্যাতনের মুখে গিয়ে পড়েন।

শিকলে বাঁধা বন্দীসহ সেলুলার কারাগার

পরিবর্তে তাঁরা এসব দ্বীপকে অমর ও বিখ্যাত করে গেছেন। এই প্রথম ব্যাচে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে যাঁদের নাম উল্লেখ করতে হয়, তাঁরা হলেন ইউনাইটেড প্রভিন্স বা সংযুক্ত প্রদেশের ফজলুল হক, গুজরাতের গরবদাস প্যাটেল, হায়দরাবাদের মৌলবী সৈয়দ আলাউদ্দিন, অসমের বাহাদুর গোয়নবুরা। এমনকি ওয়াহাবি আন্দোলনের নেতা আব্দুর রহিম সাদিকপুরী এবং পাঞ্জাবের কুকা বিদ্রোহীদেরও সেখানে পাঠানো হয়। যাঁরা এখানে ছিলেন তাঁদের মধ্যে সাভারকর ভাইরা, উল্লাসকর দত্ত, বারীন্দ্র কুমার ঘোষ, ভূষণ রায়, পৃথ্বী সিং আজাদ, পুলিন দাস, ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী, প্রমুখের নাম করা যায়। যেসব মামলার অভিযুক্তরা এখানে এসেছেন, তাঁদের মধ্যে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার হামলা, আলিপুর বোমা মামলা, বরিশাল, নাসিক এবং লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা, ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল।
বাংলার বিপ্লবীরা ব্রিটিশদের ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছিল। একটি ঘটনায় তাঁদের ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকারের পুলিশ তৎপর হতে না হতেই বিপ্লবীরা আর একটি অপারেশন চালিয়ে দিচ্ছিলেন। অবশেষে তাঁদের অনেকে গ্রেফতার হন এবং তাঁদেরও কারো কারো ঠাঁই হয় আন্দামানের সেলুলার কারাগারে। যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, মনোরঞ্জন গুপ্ত, চিত্তপ্রিয় রায়, নরেন ভট্টাচার্য্য, নরেন দাশগুপ্ত, জ্যোতিশ পাল প্রমুখ ১৯১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বালেশ্বর যাচ্ছিলেন, তখন পুলেশ তাঁদের ঘিরে ধরে। এই হামলায় তাঁদের কয়েকজন আহত হন, যতীন মুখোপাধ্যায় নিহত হন। নরেন দাশগুপ্ত ও মনোরঞ্জন গুপ্ত গ্রেফতার হন। তাঁদের মৃত্যুদ- দেওয়া হয়। জ্যোতিশ পালকে কালাপানিতে নির্বাসন দেওয়া হয় এবং তাঁকে আন্দামানে পাঠানো হয়। এভাবে বিভিন্ন মামলায় বাঙালি বিপ্লবীদের আন্দামানে পাঠানো হয়।

সেলুলার কারাগার

বরিশাল ষড়যন্ত্র মামলায় মদন মোহন ভৌমিক, ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী এবং খগেন্দ্রনাথ চৌধুরীকে আন্দামানে পাঠানো হয়। এখনো আন্দামানে ভ্রমণকারী বাঙালিরা তাঁদের পরিবারের মানুষদরে নাম সেলুলার কারাগারের তালিকায় খোঁজ করেন এবং কেউ কেউ খুঁজেও পান। তাঁরা সেকথা গর্বভরে সবাইকে বলেন।সেলুলার জেলের বন্দীদের ওপর প্রচন্ড অত্যাচার করা হতো। তাঁদের প্রায় অসম্ভব কাজ করতে বলা হতো। তাঁদের প্রতিদিন ৩০ পাউন্ড নারকেল তেল, ১০ পাউন্ড সর্ষের তেল তৈরী করতে বলা হতো। এই কোটা পূরণে ব্যর্থ হলে জুটতো অকথ্য নির্যাতন। চাবুক মারা হতো, অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে দেওয়া হতো। শেকল দিয়ে পা বেঁধে রাখা হতো। ভারী বস্তা কাঁধে তুলে চলতে হতো। এছাড়া সলিটারি সেল বা নিঃসঙ্গ কারাকক্ষে দিনের পর দিন বন্দী থাকা তো আছেই। এখনো সেখানে গেলে এসব নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। তেল তৈরীর যন্ত্র, ফাঁসীর দড়ি, পায়ে বেঁধে রাখার শিকল, নিঃসঙ্গ কারাকক্ষ, ইত্যাদি। সেই সঙ্গে স্মৃতির স্মারকও রয়েছে।
এখন পোর্ট ব্লেয়ারের সেলুলার কারাগারটি একটি জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রতিদিন প্রচুর মানুষ সেখানে যায় – কৌতূহল চরিতার্থ করতে কেউ কেউ, অন্য অনেকে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে। সেখানে এখন লাইট অ্যান্ট সাউন্ড শো হয়। সেখানে গিয়ে আমার এক অদ্ভূত অনুভূতি হয়েছে। একই সঙ্গে ভয়াবহতা ও গৌরবের। তবে প্রশ্নও জাগছে – আমরা কি তাঁদের সেই আত্মত্যাগের মূল্য দিতে পেরেছি বা পারছি?

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com