আনন্দ, অশ্রুর দাগ বুকে নিয়ে ইতিহাসের প্রাচীন শহর প্রাগ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুতফুন নাহার লতা

(নিউইয়র্ক থেকে) : প্রাগ। প্রাচীণা প্রাহা। চেক রিপাব্লিকের রাজধানী প্রাহা। পৃথিবী নামক প্লানেটের উপর এক অনিন্দ্য সুন্দরের প্রকাশ। শিল্প, সংস্কৃতি, সংগীত, চিত্রকলা, নাট্যকলা, স্থাপত্য কলা, প্রেম, যুদ্ধ আর বানিজ্যের এক অপূর্ব অবস্থান। প্রাচীন ভলতাভা নদীর তীরে গড়ে উঠেছে অভূতপূর্ব এক অপার সভ্যতা।

কথিত আছে অস্টম শতকে সেমিসল ডাইন্যাস্টির প্রতিষ্ঠাতা ডিউক সেমিসল ও তার স্ত্রী লিবুশের স্বপ্ন ছিল এ শহরকে অনিন্দ্যসুন্দর করে গড়ে তোলার। ডাচেস লিবুশে ভলতাভা নদীর তীরে উচু পাথরের উপরে দাঁড়িয়ে যত দূর চোখ যায় চেয়ে বলেছিলেন, -‘আমি দেখতে পাচ্ছি একটি অসামান্য শহর যার গৌরবময় ঔজ্জ্বল্য একদিন আকাশের সব তারা ছুঁয়ে যাবে।’ ” I see a great city whose glory will touch the stars” তিনি ভলতাভা নদীতীরে তাঁর শিল্পিত প্রাসাদ এবং সুন্দর একটি শহর নির্মানের জন্যে আদেশ দিয়েছিলেন।

মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় এই অঞ্চলেও এসেছে নানা গোত্র, নানা আদিবাসী। তেমনি পঞ্চম, ষষ্ঠ শতকেও এসেছে Celts, Slavic tribes, Germanic tribes, Marcomanni, Quadi, Lombards, Suebi আর তাদের পায়ের তলায় এই জনপদ পেয়েছে নির্মানাকুল একটি আকৃতি। রোম যেমন একদিনে তৈরি হয়নি তেমনি চেক রিপাবলিককেও যেতে হয়েছে ভাঙন গড়নের দীর্ঘ প্রস্তর পথ পেরিয়ে। নবম শতক থেকে ক্রমাগতভাবে এ শহরের শ্রীবৃদ্ধি শুরু হয় এবং তা বহু শতক ধরেই চলতে থাকে, সেই সঙ্গে রোমান এম্পায়ার ও তাঁদের রাষ্ট্রীয় প্রধান ব্যক্তিদেরও প্রিয় বাসস্থান হয়ে ওঠে বোহেমিয়ান কিংডমের রাজধানী প্রাহা।

সুন্দরী নারী যেমন লিও টলস্টয়ের আনাকারেনিনার মত, তার প্রতি যেমন লোভী, কামুক, বিত্তশালী পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে থাকে, তেমনি তিলোত্তমা প্রাহা নিয়েও চলেছে রোমান, অষ্ট্রিয়ান, হাঙ্গেরীয়ান, জার্মান, রাশান লোলুপতা। তাই বরাবরই নানা যুদ্ধ বিগ্রহের নিগড়ে বাঁধা এই দেশ। বিশ শতকে এখানে নেমে আসে এক মহাভয়ংকর দু;সময়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অষ্ট্রো হাংগেরীয়ান এম্পায়ারের পরাজয়ের পর বোহেমিয়া বদলে চেকোস্লোভাকিয়া নামে শুরু হয় তার আর এক যাত্রা। কিন্তু ১৯৩৯ এর ১৫ই মার্চ মৃত্যুর কালো তরবারি হাতে আসে হিটলারের জার্মান নাৎসি বাহিনী। হত্যা করে অগনিত জুইশ ধর্মাবলম্বি সাধারণ মানুষ। সারা দেশে গড়ে তোলে কন্সেন্ট্রেশান ক্যাম্প। প্রাগের রাস্তার দু’ধারে যত ঘর আছে তার প্রতিটি ঘরে হানা দিয়ে গাড়ী ভরে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় মানুষ। তাদেরকে পাঠানো হয় ডেথ ক্যাম্পে। এসময় পৃথিবী বিখ্যাত ঔপন্যাসিক কাফকার বোনদেরকে ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়। মিলিটারী থেকে তাঁদের স্বামীরা ফিরে আসেননি আর কোনদিন। যদিও তার আরো আগেই দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগে ১৯২৪ সালে কাফকা মৃত্যুবরণ করেন। নাজি বিরোধি আন্দোলনের বিপ্লবী নেতা জার্নালিস্ট জুলিয়াস ফুচিক ধরা পড়েন গেষ্টাপো বাহিনীর হাতে। তাঁকে নির্মম অত্যাচারের পর ১৯৪৩ এ মাত্র ৪০ বছর বয়সে বার্লিনে এনে হত্যা করা হয়। শুধুমাত্র ধর্মের কারণে পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোথাও এত মানুষ হত্যা হয়েছে বলে জানা নেই। কেবল চেকস্লোভাকিয়া থেকেই কোয়ার্টার মিলিয়ন মানুষ হত্যা হয় হিটলারের নাজি বাহিনীর হাতে এসময়।

ওই যে বলেছিলাম সুন্দরী আনাকারেনিনার কথা! যদিও এদেশকে শেষ সময়ে সোভিয়েত রেড আর্মি এসে রক্ষা করে জার্মানির হাত থেকে। উড়িয়ে দেয় বিজয় পতাকা। প্রাগ কিন্তু রেহাই পেলনা তবু! এবার এসেছে সোভিয়েত রাশিয়া। শুরু হল কমিউনিজমের নামে নিষ্পেষণ। সে ইতিহাসও কিছু কম মৃত্যু, কম রক্তপাতের নয়!

এই যে ভয়াবহ রাজনৈতিক ঝঞ্ঝা, তা পার হয়ে ১৯৯৩’র জানুয়ারিতে চেক ও স্লোভাক দুটি আলাদা দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। একভাগ চেক রিপাবলিক, অন্যভাগ স্লোভাক রিপাবলিক।

ইষ্টার্ন ইউরোপের প্রাণ জুড়ানো এই শহরকে প্যারিসের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন কেউ কেউ, কিন্তু এমন রোম্যান্টিক শহর পৃথিবীর আর কোথাও আছে বলে তো মনে হয় না। এখানে রয়েছে সারা বিশ্বের শিল্প সাহিত্যের এক মধুর হারমনি। দেখবার মত জায়গাগুলো অসাধারণ! ওল্ড টাউন স্কোয়ার, নিউ টাউন স্কোয়ার, ঐতিহাসিক চার্লস ব্রিজ, যা পুরানো ও নতুন শহরকে যুক্ত করেছে ভালোবাসায়। দশটির মত মিউজিয়াম, থিয়েটার, চার্লস বিশ্ববিদ্যালয় যা কিনা ইষ্টার্ন ইউরোপের প্রথম বা দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। রয়েছে অসাধারণ সব ক্যাথিড্রাল, মনুমেন্ট, জুইশ কোয়ার্টার, জুইশ সেমেটারি, ফ্রাঞ্জ কাফকার মিউজিয়াম, তাঁর সমাধি আর কত শত রকমের দর্শনীয় শৈল্পিক কারুকাজ।
শহর প্রতিরক্ষা ওয়ালের গায়ে কন্সন্ট্রেশান ক্যাম্প। একদিন যে প্রতিরক্ষা ওয়াল তৈরি হয়েছিল জার্মান আগ্রাসন রুখে দাঁড়াতে। রয়েছে মানুষের মৃত্যুর করুন বিউগল বাজানো স্মৃতিময় জুইশ মিউজিয়াম। স্থাপত্য কলার এক চুড়ান্ত নিদর্শন রাজার প্রাসাদ বা ক্যাসেল, ও বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সমূহ। এশহর ছিল সারা ইষ্টার্ণ ইউরোপের ব্যাঙ্ক, বীমা, ও অর্থনৈতিক লেনদেনের শহর। বিখ্যাত বোহেমিয়ান ক্রিস্টাল আর নানা ধরনের রিয়েল স্টোন এখানে প্রশংসিত।
হাজার বছরেরও আগে মানুষ কত উন্নত চিন্তার অধিকারী ছিল তা বোঝা যায় এদের নগর পরিকল্পনায়। প্রতিটি একালায় একটি করে বড় খোলা চত্বর বা স্কোয়ার, যেখানে সুখে দুখে প্রয়োজনে মানুষ এ একত্রিত হতে পারে। বসবাসের বিল্ডিং নির্মানের আগেই তারা চলাচলের রাস্তা নির্মান করেছেন। শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সহ জনগনের জন্যে পানীয় জলের সুব্যবস্থা। এখানে গরমে গরম, আর শীতে শীতল আবহাওয়া। রয়েছে দিক দিগন্ত জোড়া পাহাড়ের কোল বেয়ে আঙুরের খেত। এদেশের বিয়ার তো সারা ইউরোপের সেরা বিয়ার। রয়েছে দীর্ঘ গভীর ঘন সবুজ জংগল। আর মন মাতাল করা উদার আকাশ!

পৃথিবী বিখ্যাত সব শিল্পীর শহর প্রাগ। এখানে রয়েছে সাতটির মত ন্যাশনাল গ্যালারি। যাতে পৃথিবী সেরা শিল্পীদের শিল্পকর্ম রয়েছে। মাইকেলএঞ্জেলো, বাতিচেল্লি, পিকাসো, কুপকা, ক্লড মনে, রেনোয়া, আলফন্স মুকা, গুস্তাভ ক্লিমট, ভ্যান গহ ছাড়াও চেক শিল্পীদের নিজেস্ব পেইন্টিং ও ভাস্কর্য্য রয়েছে সেখানে। সংগীত এর জগতে উজ্জ্বল নাম মোৎসার্ট, বিটভেন, বিভাল্ডি এবং আরো আরো অসংখ্য শিল্পীর সুরের মূর্ছণায় সাজানো এই শহর। এদেশের আদি সঙ্গীতে রয়েছে দেশপ্রেমের এক করুন রস, নৃত্যে, গীতে সাজে সৌন্দর্য্যে রয়েছে হীরকের দ্যুতি। এমন মন মোহিনী এখানকার সন্ধ্যাগুলো! এমন মায়াভরা আকাশ আমি আর কোথাও দেখিনি।

আমাকে যে বিষয়টি সবচেয়ে মুগ্ধ করেছে তা এর প্রায় দুই হাজার বছরের সংরক্ষিত ঝঞ্ঝা সংকুল ইতিহাস! প্রাচীন রোমান চিকন লম্বা ইটের গাঁথুনি, আর কালো চৌকো পাথরের টুকরো বসানো পথ। এই পথই এখানে টেনে আনে সারা পৃথিবীর মানুষকে। আমার মত মন বোহেমিয়ান মানুষ তো বটেই। সারা বিশ্বের মানুষের এক অসামান্য আনন্দ কোলাহল। হাত ধরে ধরে হাটছে মানব মানবী। তাড়া নেই যেন কারো , হেলে দুলে হাটছে আর মুখে আনন্দ বিস্ময় নিয়ে দেখছে চারিদিক। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে স্থানীয় অভিনব সব খাবার খাচ্ছে মানুষ, আর তার দু’ধারে বাজছে নানা রকম বাদ্যযন্ত্র। মানুষ ইচ্ছে হলেই সেই সুরের সাথে জোড়ায় জোড়ায় নেচে চলেছে। এমন দেশ আমি আর দেখিনি কোথাও, এমন আনন্দধ্বনি আমি আর শুনিনি কোথাও, কেবল একবার! কেবল একটি মাত্র নির্ভেজাল আনন্দ বেদনার সময় ছিল আমাদেরও। যেদিন এক রক্ত ধোয়া পবিত্রতা নিয়ে স্বাধীন হয়েছিল আমার বাংলাদেশ!

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com