আত্নার আত্নীয়…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

তানভির আহমেদ

আমি যখন এই স্ট্যাটাস লিখছি, তখন তারা আকাশে উড়ছে। ভোর নাগাদ হয়তো পৌঁছে যাবে যুক্তরাষ্ট্রে।প্রায় ১৫ বছর পর দেখা। সম্পর্কের সুত্র যদি খুঁজতে যাই তাহলে আমাকে আরো ২০ বছর পেছনে ফিরে যেতে হবে। ঢাকায় তখন খন্ড কালিন চাকরি বলতে খবরের কাগজে ফ্রি-ল্যান্স সাংবাদিকতা আর টিউশনি। ফি-ল্যান্স সাংবাদিকতা করে যা পেতাম সেটার মাস শেষে হদিস পেতাম না, তবে মাস শেষে টিউশনির বেতন আর বাসা থেকে যে টাকা দিতো সেটা মিলিয়ে বেশ ভালো একটা অ্যামাউন্ট হতো যা দিয়ে ঢাকা শহরে মোটামুটি ভালো ভাবেই চলা যেত। ২০ বছর আগে ঢাকায় অভিভাবকরা তাদের ছেলে মেয়েদের পড়ানোর জন্য শুধু ঢাকা মেডিক্যাল, বুয়েট আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া স্টুডেন্ট খুঁজতো। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের স্টুডেন্টদের টিউশনি পাওয়া বড়ই ভাগ্যের ব্যপার ছিলো। আমি তথন ঢাকা সিটি কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম মাত্র। কিন্ত টিউশনি পেতে হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট কিংবা মেডিক্যালের ছাত্র হতে হবে এমন কন্ডিশনের কথা শুনে কোন উপায় না পেয়ে গেলাম এজেন্টর কাছে। এজেন্ট বললো কোন অসুবিধা নাই, আপনি খালি চুপ করে থাকবেন, অভিভাবককে যা বলার আমি বলে দেবো। আর ঢাকা সিটি কলেজে থেকে যেহেতু পাশ করেছেন, আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও টিকে যাবেন।যথারীতি এজেন্টের দেওয়া ঠিকানা নিয়ে আমি মোহাম্মদপুরে শাহ জাহান রোডের ১৯৬ নম্বর বাড়ীতে সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য হাজির হলাম।স্টুডেন্টের বড় ভাই সাজ্জাদুর রহমান আমাকে প্রশ্ন করা শুরু করলেন, সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় তার অন্যতম নির্দেশনা ছিলো তার বোনের সঙ্গে কোন ধরনের প্রেম করা চলবে না।সাজ্জাদুর রহমান তার বোনদের রক্ষা করার

মিঠুর সঙ্গে লেখক

জন্য আমাকে আগে থেকেই ধমক দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যেন আমি শিক্ষকের মাত্রা অতিক্রম না করি।ধমকে সঙ্গে সঙ্গে আমি নিশ্চিত হলাম স্টুডেন্ট হিসেবে আমি দুই ছাত্রীকে পেতে যাচ্ছি। স্টুডেন্টদের একজন ক্লাস এইটে আরেকজন ক্লাস সিক্সে। দু’জনই মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরী স্কুলের ছাত্রী। আমি অবাক হয়ে গেলাম, ক্লাস এইটে পড়া বোনের সঙ্গে প্রেম করা নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন আমার হবু ছাত্রীর ভাই। কোন প্রকার উচ্চ বাচ্য না করে শুধু বললাম, আপনার বোনের তরফ থেকে যদি কিছু না হয়, আমি নিশ্চিত করছি আমার তরফ প্রেম ঘটিত কোন কিছু হবে না।
আমাদের মধ্যবিত্তের ঘোড়া রোগ, আমাদের প্রথম প্রেম শুরু হয় ছাত্রী, মামাতো-খালাতো-ফুপাতো বোন কিংবা খালার সঙ্গে। সেই অর্থে সাজ্জাদুর রহমান হয়তো ঠিকই করেছেন। যাই হোক টিউশনিটা আমার হয়ে গেলো, বেতন ১৯ শ’ টাকা। সেই দিন ছাত্রীদের সঙ্গে আমার দেখা হলো না, যদিও দুই দুষ্টু ছাত্রী আমাকে ঠিকই পর্দার আড়াল থেকে দেখেছে। সালটা ১৯৯৭ এর দিকে ঢাকা শহরে আমার প্রথম টিউশনির জীবন শুরু। এর কিছু দিন পর আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তির সুযোগ পেয়ে যাওয়াতে দীর্ঘ মেয়াদে মিথ্যা কথা বলা থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম।

দুই পরিবার

তারপর ধীরে ধীরে সময় যতই গড়িয়েছে এই সাজ্জাদুর রহমান হয়ে উঠলেন আমার অত্যন্ত কাছের মানুষ, আপন জন, বড় ভাই,অভিভাবক। সাজ্জাদ ভায়ের ‘মা’য়ের মতমতায় আমি ‍ছুটির দিনেও পড়াতে চলে আসতাম। আন্টির নির্দেশে প্রতি বছর সুমান্তা – সুচি কেইক কেটে আমার জন্মদিন পালন করতো তাদের বাসায়। সুমান্তা আমার কাছে পড়েছে ২০০০ সাল পর্যন্ত, সুচি আরো দু’বছর বেশী। ২০০১ সালে সুমান্তাকে মার্কিন নাগরিক এক পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেন তার ভাই সাজ্জাদুর রহমান। তার পর থেকেই সুমান্তা যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হয়েছে। এই দুই বোন শুধু আমার ছাত্রীই ছিলো না, আমার আপন বোনের চেয়ে কখনো আমি ভিন্ন ভাবে দেখিনি। বয়সে একটু বড় হবার কারণে সুমান্তা হয়ে উঠেছিলো বন্ধু, কখনো কখনো বন্ধুর চেয়েও বেশী। এই দুই বোনকে পড়ানোর সুবাদে আমি মোহাম্মদপুরে একের পর এক মেয়ে ছাত্রীকে পড়ানোর অফার পেতে থাকলাম। মোহাম্মদ প্রিপারেটরী স্কুলের প্রায় ডজন খানেক মেয়েকে আমার পড়াতে হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। তবে এই টিউশনিটাই ছিলো রাজধানী ঢাকায় আমার সাবলম্বী হয়ে উঠার প্রথম টার্নিং পয়েন্ট।

সুমান্তা বিয়ে করে যুক্তরাষ্ট্র চলে যায় প্রায় ১৬ বছর আগে। বছর দু’য়েক হলো সুচিও যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘ একটা বিরতিতে বদলে গেছে অনেক কিছু, কিন্তু আমাদের সম্পর্ক গভীর হয়েছে আরো বেশী। সাজ্জাদ ভাই বাংলাদেশে, আমি লন্ডনে আর সুচি-সুমান্তা ইউএস এ। কেউ কখনো দূরে রয়েছেন বলে মনে হয়না। প্রযুক্তি, ফেইসবুক আমাদের অনেক আপন করে রেখেছে। গত সপ্তাহে সুমান্তা তার দুই সন্তান আর স্বামী মিঠুকে নিয়ে আমাদের লন্ডনের বাসায় এসেছিলো বেড়াতে। দুই দিন ওদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আমি আমার স্ত্রী এতটাই নিজেদের হারিয়ে ফেলেছিলাম যে ওরা যাবার পর থেকে আমাদের বাড়ীটা একদম শূণ্য হয়ে গেছে। ভীষণ মিস করছি ওদের….।

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com