আটলান্টিকের তীরে…-পর্ব দুই

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দীপারুণ ভট্টাচার্য্য

লেগস (Legos)

ডলার পরিবর্তন করে নাইরা নিতে হবে। নাইরা অর্থাৎ স্থানীয় মুদ্রা।

লেগস বিমান বন্দরে দেখলাম এক ডলারের দাম সাড়ে তিনশ নাইরা। কিন্তু নমস্তের অত্যাচারে তা আর করা হলোনা। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে আমরা চললাম ভিক্টোরিয়া আইল্যান্ড এর দিকে। রবিবার তাই রাস্তা ঘাট শুনশান। খানিক বাদেই এক ব্রিজে উঠলো গাড়িটা। দুদিকের সুনীল সমুদ্রের বুক চিরে আমরা চললাম 11.8 km দীর্ঘ Third Main Land Bridge এর উপর দিয়ে। আসলে অঞ্চলটি back water এ পরিপূর্ণ। সমুদ্রের জল নিচু জমিতে ঢুকে এলে এমন হয়। আর তাতে মাছ ধরছে অনেক ছোট ছোট ডিঙি নৌকা। প্রায় এমনটা আমি দেখেছি মুম্বাইতে। আমাদের ড্রাইভারের নাম, কোলে। সুন্দর তার ইংরেজি। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে সমুদ্র পাড়ে গড়ে ওঠা এক অপূর্ব লেগস। ড্রাইভারকে বললাম, একটু দাঁড়াও না ভাই, একটা ছবি তুলি। সে বলল, এখানে কোন মতেই দাঁড়ানো নিষেধ। ডান দিকে দূরে শত শত বসতি। সব নিচু লোক স্যার, আমাদের দাঁড়াতে দেখলেই ছুটে আসবে। সব ছি

লেগস এয়ারপোর্টে

নিয়ে নেবে। আজ রবিবার, তাই রাস্তায় লোক কম। পুলিশের সাহায্য পাওয়াও কঠিন। এরপর আর কথা চলে না। আমরা এগিয়ে চললাম। শহরে এসে দেখলাম বেশ উৎসবের মেজাজ। প্রচুর ছবিতে শহর ভরে আছে। লেগস শহরের কৃতী সন্তানদের ছবি সে সব। জানতে চাইলে কোলে বলল, লেগস শহর পূর্ণ করেছে ৫০ বছর। এই জাঁকজমক আর রোশনাই তারই জন্য।

বাঃ, ভালোই হলো, তোমাদের শহরের ৫০ বছরের জন্মদিনে এলাম আমরা। স্যার আপনারা যে শহর থেকে এলেন, তার বয়স কত?

আমরা এখন আসছি দিল্লি থেকে। সে শহরের বয়েস আটশো পেরিয়েছে। আর আমার নিজের শহর কোলকাতা অনেকদিন আগেই পেরিয়েছে ৩০০ বছর। বিস্মিত কোলে গাড়ি ছোটাতে লাগল।

কিছুসময় পরে কোলে বলল, স্যার ডলার ভাঙাবেন কি? সম্মতি পেয়ে এক জায়গাতে গাড়ি থামাল, ‘নামবেন না কিন্তু’। গাড়ি দাঁড়াতেই বেশ কিছু লোক দৌড়ে এলো। কত, কত কত বলতে লাগলো তারা? ড্রাইভার কোলে তাদের সঙ্গে দর করতে লাগলো। ১ ডলারে ৩৭৫ নাইরা তে রফা হলো। তবে দিতে হবে ১০০ ডলারের নতুন নোট। ৪০০ ডলার বদলে দেড় লাখ নাইরার কিছু বেশি পাওয়া গেলো।

এবার হোটেলে গিয়ে ঘুমাতে হবে। তার আগে অবশ্য ধুতে হবে এই দীর্ঘ বিমান যাত্রার ক্লান্তিকে।

এলেগুশি বিচ (Elegushi Beach)

আমরা এখানে এসেছি আট জন ভারতীয়। এর মধ্যে রাকেশ নাইরোবি তে থাকে। হোটেলে এসে ঘুম হলো না দুপুরে। পাল্টানো সময় শরীরের অভ্যাসে পরিনত হতে কিছুটা সময় তো নেবেই। বিকালে এলো ইমোমো আর গ্যাব্রিয়েল, আমাদের লেগস অফিসের সহকর্মী।

খানিকটা আলাপ পরিচয় ও গল্পের পর প্রস্তাব এলো একটু ঘুরতে যাওয়ার। বিনীত (সহকর্মী) এর এটা পঞ্চম লেগস ভ্রমণ। তাই সে সব থেকে অভিজ্ঞ। ইমোমো কে বলল বিচ-এ নিয়ে যেতে। তারপর দল ধরে খাওয়া, কোনো এক ভারতীয় রেস্তোরাঁ তে। আমরা দশ জন যাবো দুটো গাড়ি করে। ইমোমো ও গ্যাব্রিয়েল গাড়ি চালাবে। আমি গ্যাব্রিয়েল এর গাড়িতে উঠতে যাবো এমন সময় শীলেশ(সহকর্মী)  বলে উঠল

শীলেশ – শুধু শুধু বিচ-এ গিয়ে কি হবে। ইন্ডিয়াতে কি বিচ কম আছে নাকি। অন্য কোথাও চলো।

এলেগুশি বিচ

ইমোমো – ইন্ডিয়াতে বিচ কম কিছু নেই কিন্তু সেখানে আটলান্টিক আছে কি?

আমরা চললাম আটলান্টিকের সাথে দেখা করতে। এটা South Atlantic Ocean. প্রবেশ পথে গাড়ি প্রতি ৩০০০ নাইরা দিতে হলো প্রবেশ মূল্য, পার্কিং গাড়ি পিছু ২০০ নাইরা। বালি ফেলে ফেলে বিচ বড় করা হচ্ছে। তাই এই মূল্যটা দিতেই হবে। অনেক দরাদরি করেও লাভ হলো না। গাড়ি থেকে নেমে আমরা চললাম মহাসাগরের দিকে।

এ আমার প্রথম আটলান্টিক দর্শন। এর আগে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগর দেখেছি। শেষ সাগর দর্শন বছর দুয়েক আগে, গোয়ার কাছে কর্ণাটকের ‘কারবার বিচ’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একসময় ছিলেন সেখানে।

না, এদেশে কবিতার কোনো স্থান আছে বলে মনে হলো না। আমার ইচ্ছে করছিলো বিশাল বিশাল ঢেউয়ের সামনে দাঁড়িয়ে গেয়ে উঠি, ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’, হলো না। জায়গাটা উদ্দাম সঙ্গীতে পরিপূর্ণ। এখানে রবি বাবুকে না আনাই ভালো।

ব্রিটিশ সরকারের কলোনি ছিলো এটা। আমরাও তো তাই। কিন্তু পার্থক্য অনেক। ব্রিটিশ আসার আগে এখানে ছিলো শুধুই উপজাতি। স্বল্প দিনেই তারা নিজেদের সব কিছু ছেড়ে ব্রিটিশের অক্ষম অনুকরণ শুরু করে। এসে থেকে দেখছি এরা নিজেদের মধ্যেও ইংরেজিতেই কথা বলছে। আসলে প্রায় পাঁচশো’র মতো ভাষা আছে এখানে। প্রধান ৩টি। তবে সে ভাষাতে সাহিত্য নেই, তাই ব্যাবহার ও সামান্য। এখানে যে ভিক্ষা করেন সে ও ভাঙা ইংরেজিতেই কথা বলেন।

এলেগুশি বিচ-এ রবিবার বিকালে বেশ ভিড় ছিলো। গ্যাব্রিয়েল বলল, শনিবার এলে পার্কিং ও পাওয়া যায়না। একটু চলতে না চলতে আমাদের ছেঁকে  ধরলো জনগণ। বিচ-এর উপর প্রচুর ‘বার’, উদ্দাম সঙ্গীত চলছে তাতে। মাংস পোড়ানো হচ্ছে। নাচ গান হৈ-হুল্লোড়। সবাই ডাকছে, আমাদের বারে আসুন। ঘোড়ায় উঠুন, এটা ওটা কিনুন, ইত্যাদি। বেশ অস্বস্তিকর তাদেরকে ‘না’ বলা। তাই সবাইকে আমরা ইমোমো আর গ্যাব্রিয়েল এর সাথেই কথা বলতে বললাম। হাঁটছিলাম ওদের সঙ্গে সঙ্গেই। দূরে গেলেই বিপদ হতে পারে।

দূরে সারি সারি জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে। কাছেই ‘পোর্ট আপাপা’। সমুদ্রের কাছে ছিলাম প্রায় ঘন্টা খানেক। তবে নিরিবিলিতে গল্প হলোনা আমার নতুন বন্ধু আটলান্টিকের সঙ্গে। সন্ধে নামার আগেই আমরা বিচ ছাড়লাম। গন্তব্য ভারতীয় রেস্তোরাঁ, Spice Route, রাতের খাবার সেখানেই খেতে হবে।

আমাদের পিছনে পুরোদমে চলছে নাচ, গান, পান ও সমুদ্র স্নানের কেমন এক বকচ্ছপ জীবনযাত্রা ।

খেতে চাই, কোথা যাই:

নাইজেরিয়াতে খাবার সমস্যা হবে, অনুমান করে কিছু খাবার দিল্লী থেকেই  এনেছি। কাল সকালে ও দুপুরে তাই দিয়েই কাজ চলেছে। এলেগুশি বিচ ( Elegushi Beach ) থেকে আমরা চললাম ভারতীয় রেস্তোরাঁ Spice Route এ. বছর দুয়েক আগে ঋষি ও বিনীত খেয়েছে এখানে। খাওয়া নিয়ে বাংলার মানুষদের একটা দূর্নাম আছে। আমরা নাকি সব জায়গাতেই বাঙালি খাবার খুঁজি। দলে অবশ্য আমিই একমাত্র বাঙালি। আর আমার এমন কোনো অভিপ্রায় নেই।

খাবার

রেস্তোরাঁটিতে ঢুকেই বিশাল বুদ্ধের মূর্তি দেখে মনে হবে এশিয়াতেই আছি। খাবারের স্বাদ ও এক কথায় অসাধারণ। এতো ভালো উত্তর ভারতীয় খাবার সত্যি বলতে আমি দিল্লির কোনো রেস্তোরাঁতেও কোনোদিন পাইনি। তার থেকেও বেশি আনন্দ পেলাম বিল দেখে। ১০ জনের ভরপেট খাওয়া খরচ মাত্র ৫৩,০০০ নাইরা। যা কিনা ১১ হাজার ভারতীয় মুদ্রার সমান।

এরপর একদিন খেতে গেলাম কম্বল ল্যান্ড নামের এক রেঁস্তোরাঁতে। নাম শুনে বিরাট কিছু মনে হয়েছিলো। এসে দেখলাম, সম্পূর্ণ ভারতীয়। অশ্বিনী আগেই এসেছিলো একদিন। তাই ভেতরে এসেই একজনকে ডেকে পরিষ্কার হিন্দিতে বলল, রাজেশ জি আমাদের একটু দেখবেন। দেখলাম সিঙ্গারা থেকে শুরু করে রুটি, মটর পনির, ডাল মাখানি, তন্দুরী চিকেন ও মটনের স্বাদ সম্পূর্ণ স্বদেশী। বৃদ্ধ ভারতীয় লোকটি যে মালিক, সেটা বুঝতে পারলাম। সন্ধে আটটা বাজতে না বাজতেই সমগ্র রেঁস্তোরাঁটি যে কোন এক সাধারণ দিল্লির রেঁস্তোরাঁর রূপ নিলো। যে সব কৃষ্ণ বর্নের মানুষ খাবার পরিবেশন করছেন, দেখলাম অল্প বিস্তর হিন্দি জানেন তারাও।

বাইরে আমাদের জন্য অপেক্ষাতে ছিলো আমাদের ড্রাইভার মিস্টার কোলে। এখানে রেস্টুরেন্টে খেতে আসলে একটা বিষয় সব সময় মাথায় রাখা উচিত। খাবার আনতে হবে প্রয়োজনের চেয়ে কিছু বেশি। না নষ্ট করার জন্য নয় আদৌ। আপনি একবার বললেই হোটেলের লোকেরা সুন্দর করে গুছিয়ে বেঁধে দেবে অতিরিক্ত খাবার। অবশ্যই আপনার ড্রাইভারের জন্য। ড্রাইভাররাও কিন্তু অপেক্ষাতে থাকে। অপেক্ষাতে থাকে তাদের বাড়ির লোকজনও। আর একটা কথা বলি, এ দেশে কিন্তু এঁটো-কাঁটার কোন বাদবিচার নেই। তাই ওসব খুঁতখুতেমি মনে না রাখাই ভালো।(চলবে)

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com