আটলান্টিকের তীরে…পর্ব- তিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দীপারুণ ভট্টাচার্য্য

ওজন বুঝে ভোজন:

তারকা হোটেলে প্রাতরাশ নিয়ে তেমন চিন্তা করতে হয়না। কিন্তু আজ তৃতীয় দিনে এই পাঁচতারা হোটেলের প্রাতরাশ টেবিলে বসে এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো। হঠাৎ করে মনে পড়ল সুকুমার রায়ের গন্ধ বিচারের লাইন ; “গন্ধ শুঁকে  মরতে হবে, এ আবার কি আহ্লাদ”। এক অদ্ভুত গন্ধ ম’ম করছে সর্বত্র।

শরীর ও মন এখনও মানিয়ে উঠতে পারেনি সাড়ে চার ঘন্টার সময়ের পার্থক্য। তাই যত রাতেই বিছানাতে যাইনা কেন ঘুম ভেঙে যাচ্ছে সকাল ৪-৫টার পর পরই। কেননা দেশে তখন সকাল দশটা। আমার বেলা পর্যন্ত ঘুমের অভ্যাস নেই।

মাছ ভাত​

কাল সকাল ৬.৩০ এ গেলাম প্রাতরাশ খেতে। তখন সবে আলো ফুটছে লেগস শহরে। প্রাতরাশও শুরু হয়েছে সবে সবেই; আমিই প্রথম। ফল নিলাম প্লেট ভরে। এখানে আনারস, তরমুজ ও পাকা পেঁপের স্বাদ অসাধারণ সুন্দর। মনে হয় এই মাত্র পেড়ে আনা হয়েছে গাছ থেকে।

একটি কৃষ্ণাঙ্গ  মেয়ে জগিং করে এলো প্রাতরাশ খেতে। বসলো আমার পাশেই। সকাল ৬:৩০ টা তেই তার থালা ভর্তি ভাত আর ‘বিফ কারী’। কারীর গন্ধে মন ভারী হয়ে উঠলো। স্নিগ্ধ সকাল আর ফলের বিশুদ্ধতা কোথায় যেন মিলিয়ে গেল, এক মুহূর্তে।

গত পরশু গিয়েছিলাম ইকিজা অঞ্চলে। তিন চার জন কাস্টমারের সঙ্গে দেখা করতে। অদ্ভুত বিষয় হলো, এখানে কারও সঙ্গে দেখা করতে গেলে জল দেওয়ারও দস্তুর নেই। চা বা কফি তো অনেক পরের ব্যাপার। তখন দুটো বাজে। এক মিটিং সেরে আর এক মিটিংয়ে যাবো। গলা শুকিয়ে কাঠ। খিদে চরমে। গাড়িতে আমি, ঋষি, বিনীত, শশী আর ইমোমো।

ঋষির সব চেয়ে বেশি খিদে পায়। আর খাবার বিষয়েও তার তেমন বাদ বিচার নেই।

ইমোমো আমাদের যে জায়গাতে নিয়ে গেলো তার নাম, মেগা চিকেন। দেশীয় KFC বলা যেতে পারে। গাড়ি থেকে নেমেই বিনীত বলল, এখানে খেতে পারবি না। দরজার ভিতরে এক পা দিয়েই বুঝলাম কথাটা কত সত্যি। গন্ধ শুঁকেই ভানুর মতো বলতে ইচ্ছা করলো, ‘নাকের ভিতর দিয়া মরমে পশিল, আকুল করিলো মন ও প্রাণ’।

প্রাতরাশ

ঋষি’র ডাক উপেক্ষা করে আমি, বিনীত ও শশী বিস্কিট ও কোকাকোলা কিনলাম। এছাড়া এখানে আর কিছুই আমাদের জন্য নেই। ইমোমো একগাদা আলু ভাজা, কিছুটা মাংস ও ভাতের এক মিশ্রণ নিয়ে এলো। ঋষি নিয়ে এলো হলুদ ভাত আর চিকেন কারী। ইমোমো বলল, এটাই আধুনিক নাইজেরিয়ার বিশুদ্ধ স্বাদ।

এক চামচ মুখে দিয়েই ঋষি আমাকে আর বিনীতকে অনুরোধ করতে আরম্ভ করলো। শশী নিরামিষ খায়। বিনীত মানা করতেই তার সম্পূর্ন অনুরোধ এসে পড়লো আমার উপর। আমি বললাম, বিস্কুট কি আর এক প্যাকেট আনবো? ঋষি বেজার মুখে থালা সরিয়ে রেখেছে ততক্ষণে। আমরা ইমোমো’র খাবার শেষের অপেক্ষা করছি। এমন সময় পাশের টেবিলে বসে থাকা একজন আমাদের খাবারের দিকে ইশারা করলো। একটু পর বিষয়টা ঋষির ও নজরে পড়ল। বলল, দিয়ে দেবো নাকি? থালায় ঋষির আধ খাওয়া ভাত-চিকেন আর এঁটো চামচ। ঠিক বুঝতে পারলাম না। ইমোমো কে বলতেই সে বলল, তুমি চাইলে দিতেই পারো।

সে যদি খারাপ মনে করে?

চাইছে যখন তখন খারাপ কেন ভাববে!

যদি আমদের বুঝতে ভুল হয়?

তবে দিও না।

ঋষি বলল, খাবার নষ্ট করা ঠিক নয়। প্লেট এগিয়ে দিতেই লোকটা খেতে আরম্ভ করলো মহানন্দে।

চুল বুলি আফ্রিকা:

চুল সম্পর্কে জীবনানন্দ দাশের দুটি লাইন মনে আসছে।

(১) “তোমার নিবিড় কালো চুলের ভিতর, কবেকার সমুদ্রের নুন”।

(২) “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা”।

হ্যাঁ চুল নিয়ে আমরা চিন্তিত থাকি সারা জীবন। চুল উঠে যাওয়ার চিন্তা, পেকে যাওয়ার চিন্তা বা টাকের চিন্তাতে আমাদের ঘুম চলে যায়।

আফ্রিকার এই দেশে এসে চুল নিয়ে একটু চুলচেরা বিচার করতে গিয়ে দেখলাম এখানে চুলো চুলির কিছু নেই। জন্মগত ভাবে এদের চুল অত্যন্ত বিশ্রী, কোঁকড়া ও ঝাঁকড়া হয়ে থাকে, চিরুনি করা যায় না। অনেকের চুল এ

তটাই মোটা ও কোঁকড়া যে মাথায় তাকে ধারণ করাই অসম্ভব। ছেলেরা চুল কেটে ন্যাড়া হওয়াতেই বেশি আনন্দ পায়। তাই ৯৫% ছেলেরাই এখানে ন্যাড়া।

চুল বুলি

কিন্তু মেয়েরা তো ন্যাড়া হতে পারেনা। আগেকার দিনে হিন্দু বিধবাদের ন্যাড়া করে দেওয়া হতো। কেননা মহিলাদের চুলহীন অবস্থায় দেখলে পুরুষদের মধ্যে কামনার আকর্ষণ কমে যায়। সেটা এখানে কোনো ভাবেই কাম্য নয়। বরং উল্টোটাই প্রয়োজন। তাই মেয়েরা চুলের পরিচর্যা করে অন্য ভাবে। কি ভাবে? বলছি এক একে।

যারা খুবই দরিদ্র কিংবা বয়েস অনেক তারা মাথা কামিয়ে একটা কাপড় বেঁধে রাখেন। যারা প্রচুর অর্থ ও সময়ের মালিক তারা নিয়মিত পার্লারে গিয়ে চুল সোজা করেন। বিষয়টা যে শুধু অর্থ দিয়ে হয় তা নয়। খানিকটা ভালো চুলও থাকতে হবে। এনাদের হাজার রকমের জেল ক্রিম ইত্যাদি ব্যাবহার করতে হয় প্রতিদিন।

বাকিরা চুলকে সৃজনশীল করে তোলেন এক বিশেষ উপায়ে। এখানে তাকে বলে attachment. পার্লারে গিয়ে করতে হয় সে সব কাণ্ড কারখানা। সেখানে কিছু কিছু চুলকে গোছা করে তাকে সুতো দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। এমন ভাবে তৈরি হয় অনেক অনেক গোছা। সেই গোছা গুলোকে মোটা করার জন্য চুল গুলোকে বিশেষ পদ্ধতিতে প্যাচানো হয়। সব থেকে কম খরচের বাঁধনের জন্য ব্যাবহার হয় উল। দিল্লি হাটের সামনে এমন চুল বাঁধতে দেখেছি আমি। একটু বেশি খরচ করতে পারলে সিনথেটিক চুল দিয়ে চুল বাঁধা হয়। যারা আরও খরচ করতে পারেন, তাদের চুল বাঁধা হয় সত্যিকারের চুলদিয়ে।

আগে আমাদের দেশের মেয়েরা তাদের উঠে যাওয়া চুল জমিয়ে রাখতেন। সে চুল কেনার লোক ছিলো। তারা এসে বাসন বা ওই রকম টুকিটাকি জিনিসের বিনিময়ে চুল নিয়ে যেতো। যারা বাসন নিতো না তাদের জন্য টাকা। ১৫০০-২০০০ টাকা কেজি ছিলো এই উঠে যাওয়া চুলের। কে জানতো সেসব চালান হচ্ছে আফ্রিকা!

গতবার বছর পুজোতে একটা শ্রুতি নাটক করেছিলাম, “গোপন কথাটি”। সেই ধনী মেয়েটির গল্প যার দাঁত ও চুল সম্পূর্ণ নকল। এখানকার মেয়েরা এবিষয়ে সবাই সমান। যারা এতো সব ঝামেলায় পড়তে চান না তারা মাথা কমিয়ে পরচুলা ব্যাবহার করেন। আগেকার দিনে বিয়ের আগে মেয়ে দেখতে গিয়ে নাকি চুল টেনে সত্যি মিথ্যা যাচাই করা হতো। কি জানি এই সব সন্দেহ আফ্রিকা থেকেই আমদানী কিনা!

ECO ATLANTIC (ইকো আটলান্টিক):

লেগস শহরটির কয়েকটা অংশ আছে। বিষয়টা গুগল ম্যাপে দেখলে পরিষ্কার হবে। মোটা ভাষায় বলতে গেলে একটি অংশ Main Land অন্যটা Island. 11.8 km দীর্ঘ Third Main Land Bridge লেগস এর life line যা Island কে মুলভূমির সঙ্গে জুড়েছে।

সাধারণত ধনী লোকেরাই Island গুলোতে থাকেন। আমি যে হোটেলে আছি সেটা ভিক্টরিয়া আইল্যান্ড এ। পাশে আছে লেকী আইল্যান্ড। জায়গা ভালো কিন্তু সাধারণের সাধ্যের মধ্যে নয়। তাই অনেকেই মেনল্যান্ড থেকে রোজ কাজ করতে আসেন আইল্যান্ড গুলোতে।

ইকো আটলান্টিক

কিছু ব্যাবসার আশায় আমরা গিয়েছিলাম ইকো আটলান্টিকের অফিসে। South Energyx কে বলা যেতে পারে Land Development company. ভিক্টরিয়া আইল্যান্ড লাগোয়া সমুদ্রের ১৬-১৭ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে তারা চালাচ্ছে তাদের কর্মকাণ্ড। তৈরি হচ্ছে লেগসের নতুন ভবিষ্যৎ, ইকো আটলান্টিক। পুরো অঞ্চলটি গভীর সমুদ্র থেকে তুলে আনা বালি দিয়ে ভর্তি করা হয়ে গেছে। বাড়ি তৈরি হতেও শুরু করেছে। আমাদের ব্যাটারি চালিত বাসে পুরো প্রজেক্ট অঞ্চলটা ঘুরে দেখালেন তারা। সত্যি বলতে উনিশ তলার উপর থেকে আগামীর লেগস কে দেখতে লাগছিলো স্বপ্নের মতো। আটলান্টিকের পাশের এই মনোরম পরিবেশে থাকতে পারলে কি ভালোই না হতো!

ইউরোপীয় ম্যানেজার, জন ডেনিশ বললেন, ফ্রী জোন স্ট্যাটাস আছে আমাদের। তাই এখানে বাড়ি কিনতে পারবেন যে কেউ। যে কোনো বস্তু আমদানি করতে পারবেন শুল্ক হীন পথে।

তার কথা শুনতে শুনতে আর আশপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে কেমন একটা আবেশে ডুবে গেলাম। কিন্তু প্রশ্নটা কে করবে বুঝতে পারছিলাম না। শেষে শশীধর উৎসাহ নিয়ে বলেই ফেলল, দু-কামরার দাম কত রেখেছেন দাদা? উত্তর এলো $710,000 মানে প্রায় পাঁচ কোটি।

নীচে নেমে এসে ফেরার গাড়ি ধরলাম। এ স্বপ্ন এ জন্মে সত্যি হবার নয়!(চলবে)

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com