আটলান্টিকের তীরে…পর্ব- চার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দীপারুণ ভট্টাচার্য্য

প্রতিদিন,খুঁজে নিন

ছেলেবেলা থেকেই কিছু বিষয় আমাদের মাথায় গেঁথে যায়। এই বড় বেলায় এসে উল্টো কিছু দেখলে অবাক লাগে। তেমন একটা বিষয় হল নাইজেরিয়ার পেট্রোল ও ডিজেলের দাম। ভারত তার প্রয়োজনের প্রায় ৮০% তেল আমদানি করে। তাই আমাদের দেশে তেলের দাম বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্ত ডিজেলের দাম চিরকাল পেট্রোলের থেকে কম রাখা হয়।  এদেশে বিষয়টা সম্পূর্ণ উল্টো। ডিজেল লিটার প্রতি ২০৫ নাইরা আর পেট্রোল ১৪৫ নাইরা (৫ নাইরা = ১টাকা)। আমাদের দেশে ডিজেলের দাম কম রাখার কারণ, এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমে। কারণ বস্তু পরিবহনের ট্রাক গুলোই সবচেয়ে বেশি ডিজেল ব্যাবহার করে। এছাড়াও কৃষিকাজ, জলসেচ ইত্যাদি কাজে প্রচুর ডিজেল ব্যাবহার হয়।

তেল সমৃদ্ধ দেশ নাইজেরিয়া সরকারের ধারণা অবশ্য অন্য। এখানে ডিজেলের দাম বেশি করা হয়েছে সরকারি আয় বাড়াতেই। তবু তেলই এখানে এক মাত্র সস্তা বস্তু। এয়ারপোর্টে এক বোতল জল কিনতে গিয়ে দিতে হলো ৩০০ নাইরা। বাকি সবের দাম শুনলে চোখ কপালে উঠবে। হোটেলের ভাড়া ৬৫ হাজার প্রতি রাত। বাজারের ব্যাগে টাকা নিয়ে গিয়ে মানি ব্যাগে বাজার আনার অবস্থা।

এখানকার বিদ্যুতের অবস্থা চিন্তা করলে কান্না পায়। প্রায় উনিশ কোটি মানুষের দেশে বিদ্যুৎ আছে মাত্র ৩০০০ মেগাওয়াট। সত্যিকারের সরবরাহ হয় ২০০০-২৫০০ মেগাওয়াট। ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লিতেই বিদ্যুৎ সরবরাহ হয় ৬০০০ মেগাওয়াট এর বেশি। আমার দেশের মোট উৎপাদন ও সরবরাহ ২ লক্ষ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে অনেক দিন আগেই। নাইজেরিয়াতে প্রায় প্রতিটি ঘরেই দুটি করে জেনারেটর সেট রাখতে হয়। একটি ছোটো যা নূন্যতম প্রয়োজনের জন্য। দ্বিতীয়টি হবে বড় যাতে চলবে AC এর মতো বড় লোড। আবুজা ও লেগস শহর দুটিতে সরবরাহ হয় সারা দেশের ৭০% বিদ্যুৎ। তবুও লেগস শহরের কোন ঘরে যদি সারাদিনে ২-৩ ঘন্টা বিদ্যুৎ আসে তিনি নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতেই পারেন।ভাবলে অবাক লাগে বিদ্যুৎ দিতে ব্যর্থ সরকার ডিজেলের দাম বাড়িয়ে জেনারেটর সেট থেকে রোজগার করছে!

উল্টোদিকে দাম কম হওয়ায় এখানে সব গাড়িই পেট্রোলে চলে। নিজেদের উৎপাদন না থাকাতে এখানে গাড়ি মাত্রই বিদেশ থেকে আনা “রি-কন্ডিশন কার”। যেমন আছে বাংলাদেশে। ঢাকার মতো এখানেও সিংহভাগ বাজার দখল করে আছে টয়োটা।

কথাবার্তা ইংরেজিতে হয় বলে যোগাযোগ এখানে খুবই সহজ। ড্রাইভাররা এতো পরিষ্কার ইংরেজি ভাষায় কথা বলে যে কখনোই কোন সমস্যা হয়না। তাদের সুন্দর ব্যাবহার ও বিনম্র আচরণে মুগ্ধ হওয়াই স্বাভাবিক। শেষ দিনে ড্রাইভার মিস্টার কোলেকে ২৫০০ নাইরা দিলাম। মাথা নিচু করে বুকের বাদিকে হাত রেখে সে বলল, Thanks a lot sir, your support is appreciated.

জীবিকাআফ্রিকা

নাইজেরিয়া গিয়ে একটা বিষয় পরিষ্কার হলো। টেকনিক্যাল লোকেরা যদি দেশীয় রোজগারে অখুশি হন তবে নিশ্চিন্তে চলে আসতে পারেন এদেশে। এখানে বিভিন্ন দেশীয় (আফ্রিকা) বা বহুজাতিক সংস্থার উচ্চ পদে চাকরী করা লোকেদের মধ্যে অধিকাংশই ভারতীয়। সম্ভবত নাইজেরিয়ার লোকেরা বেশ খানিকটা অলস ও আরামপ্রিয়। কাজেই কোম্পানীর ম্যানেজমেন্ট তাদের উপর ততোটা ভরসা করেন না। এককালে নিশ্চয়ই ইউরোপ বা আমেরিকার লোকেরা এখানে কাজ করতো। কিন্তু আধুনিক প্রতিযোগিতায় তারা ভারতীয়দের কাছে হারছে ক্রমাগত। কারণ ভারতীয়দের সীমিত চাহিদা ও অধিক সময় কাজ করার মানসিকতা।

ইঞ্জিনীরিং প্রোজেক্ট এর কথা আলোচনা করলে, আমার বিশ্বাস, বর্তমান ভারতই বিশ্বকে দিতে পারে সস্তা সুন্দর ও মজবুত সমাধান। অন্তত ইলেক্ট্রিক্যাল ক্ষেত্রে আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি যে, ভারতে তৈরি যন্ত্রাংশ এখন চীনের থেকেও সস্তা ও সুন্দর। আমরা পিছিয়ে পড়ছি বিশ্বব্যাপী চীনের আগ্রাসনের জন্য। দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ, সুশাসন ও রপ্তানীতে সরকারের সঠিক নীতি ও সুদৃষ্টি পেলে ভারত চীনকেও টেক্কা দিতে পারবে অনেক অংশেই।

যাই হোক, নাইজেরিয়াতে বিভিন্ন কোম্পানীতে উচ্চ পদে ভারতীয়দের দেখে বেশ ভালো লাগলো। ব্যাক্তিগত আলাপ হলো কয়েকজনের সঙ্গে। সংকল্প তাদেরই একজন। গুজরাটের এই ছেলেটি আমারই বয়সী হবে। প্রায় নয় বছর ধরে আছে এদেশে। দায়িত্ব নিয়ে চালাচ্ছে একটা অটোমেশন কোম্পানী। এখানে সে ছাড়া বাকি সবাই স্থানীয়। তার স্ত্রীও কাজ করেন এক দুরাভাষ সংস্থায়। বছরে দুইবার ভারতে আসেন। তেমন অভাব নেই কিছুই।

আলাপ হলো মিস্টার গুপ্তার সাথেও। উত্তর প্রদেশের এই মানুষটি যে কোম্পানীতে কাজ করেন সেটি নাইজেরিয়ার সবচেয়ে বড় বেসরকারি সংস্থা। কথায় কথায় বললেন, সবই আছে তবে জীবনটা ভারতের মতো অতটা খোলামেলা নয়। যাকিছু করার বা যেখানে খুশি যাওয়ার স্বাধীনতা নেই এখানে। বন্ধু বা আত্মীয়দের আনন্দ অনুষ্ঠানেও থাকতে পারিনা। হোলি বা দীপাবলির সময় বেশ কষ্ট হয়।

আমি বোকার মত প্রশ্ন করলাম, তাহলে?

একটু থেমে মৃদু হেসে গুপ্তা জি বললেন, তাহলে আর কি; ডলার সব কিছু ভুলিয়ে দেয়।

এটাও জীবনের এক দৃষ্টিভঙ্গী। সেই ইংরেজি প্রবাদ মনে পড়ছে:

Money money money, brighter than sunshine, sweeter than honey.

সংশয়

এই দেশে আসার আগে অনেকেই ভয় দেখিয়েছিল। বলেছিল, জায়গাটা নিরাপদ নয় আদৌ। একজন বলল, সে পাঁচ বছর আগে এসেছিলো এই শহরে। লেগস থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরের এক তেল কারখানা তে তাকে যেতে হতো রোজ। তার কোম্পানি তাকে দিয়েছিলো এক SUV গাড়ি আর দুই জন বন্দুকধারী নিরাপত্তা কর্মী। তবু তাদের পথ আটকায় তারা। বন্দুকধারী নিরাপত্তা কর্মী বসে থাকে চুপ চাপ। তারা গলায় বন্দুক ঠেকিয়ে জানতে চায়, কি আছে?

পকেটের ২০০ ডলার আর ল্যাপটপ ব্যাগটা নিয়ে নেয় তারা। বন্ধুর অনুরোধে অবশ্য ফিরিয়ে দেয় তার পাসপোর্ট, টিকিট আর দরকারি কাগজ পত্র।

কেউ কেউ বলেছিলো ও সব শহরের বাইরে হয়। লেগস শহরে এসব নেই। দেখে অবশ্য আমারও তাই মনে হলো। তবে সাবধানে থাকাই ভালো। গাড়ি ছাড়া কোথাও যাওয়া উচিত নয় আর রাস্তা দিয়ে পায়ে হেঁটে চলা উচিত নয় একদমই। ঘটনা যে হবেই এমন নয় তবে পায়ে হাঁটলে ছিনতাই হবার সম্ভাবনা থাকে সব চেয়ে বেশি।

কথাটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল রচিতের সঙ্গে। সে স্থানীয় এক কোম্পানির বড় অফিসার। বলল, খানিকটা ভাগ্য জানো। যাদের সঙ্গে হয় না তাদের কিছুই হয় না। আবার যাদের হয় তাদের সঙ্গে খুব খারাপ কিছুও হতে পারে। আমার এক পরিচিত ছেলে এসেছিল এখানে। একটা ছোট কোম্পানিতে কাজ নিয়ে। এমন অ্যাপার্টমেন্টে থাকতো যাদের নিরাপত্তা ততটা নয়। একদিন মাঝরাতে ৮-১০জন তার ঘরে চড়াও হয়ে ডাকাতি আর মারধর করে। তারপর আমাদের বাড়িতে এনে রেখেছিলাম তাকে। একদিন অফিসের থেকে ফেরার পথে অটো থামিয়ে তার টাকা, মোবাইলে ঘড়ি লুট হয়। এর পর সে আর থাকতে চায়নি এ দেশে।

গল্পটা শুনে কেন জানিনা সবাইকে সন্দেহ করতে ইচ্ছা করছিলো। এমন সময় সমীর বলল, ‘আমাদের কথাটা বলুন’। আরও কিছু আছে নাকি?  এবার রচিতের নিজের অভিজ্ঞতা।

রাত আড়াইটের সময় টেন্ডারের সব ফাইল গুছিয়ে আমরা বেরোলাম। সকাল দশটায় জমা দিতে হবে। গাড়িতে স্থানীয় ড্রাইভার ছাড়া আমরা চার জন ভারতীয়। অফিস থেকে বেরিয়ে ৩০০ মিটার যাবার পর ডানদিকে ঘুরতে না ঘুরতেই দেখলাম একটা মিনি বাস দাঁড়িয়ে আছে রাস্তা জুড়ে। বুঝলাম বিপদে পড়েছি। গাড়ি দাঁড়াতেই দেখলাম কাঁচের বাইরে বন্দুকধারী। কাঁচ নামিয়ে বললাম, আমরা তোমাদের সাহায্য করবো। তোমরা আমাদের ক্ষতি করোনা।

ড্রাইভারকে নামিয়ে মিনি বাসে তুলল তারা। আমাদের গাড়িতে দুই জন উঠলো। একজন গাড়ি চালাচ্ছে অন্য জন বন্দুক তাক করে আছে। কোথায় যাচ্ছি জানিনা। প্রায় ঘন্টা খানেক পর এক শুনশান জায়গাতে গাড়ি থামালো। জায়গাটা লেগস শহর থেকে প্রায় ১০০কিমি দূরে। মিনি বাস টা ও দাঁড়াল আমাদের পিছনে এক এক করে সবার সব কিছু নেওয়া হলো। টাকা, ঘড়ি, সোনা, ল্যাপটপ, মোবাইল সবই। সেগুলো আমাদেরই এক ব্যাগে পুরে রাখা হলো আমাদের গাড়িতেই। বুঝলাম গাড়িটিও লুট হচ্ছে। ড্রাইভারকে হাত পা বাঁধা অবস্থাতে ফেলে দিলো রাস্তার উপর। আমাদের গাড়িটা স্টার্ট দিতেই সমীর চিৎকার করে উঠলো। please leave the tender documents. কি মনে হলো কে জানে, ডিগি খুলে আঠারোটা টেন্ডার ফাইল ফেলে দিলো রাস্তাতে। গাড়ি দুটো চলে যেতেই অন্ধকার ছাড়া কিছুই রইলো না আমাদের সঙ্গে।

কয়েক ঢোক জল খেলাম আমি, তারপর?কি করে ফিরলে সেই শুনশান পুরী থেকে?

রচিত বলল, আসলে ওরা ড্রাইভারের ফোনটা নিতে ভুলে গেছিলো। সেই ফোনে কথা হলো, অফিসের সাথে। তারা যখন এলো তখন বেশ সকাল হয়ে গেছে।

রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নেওয়া টেন্ডারটা জমা দিতে ছুটলাম তখন। শুনলে তোমার ভালো লাগবে, ওই টেন্ডারটা আমরাই জিতেছিলাম।

শুনতে শুনতে অবাক লাগছিলো। থাকতে থাকতে আর দেখতে দেখতে কত কিছুই গা সওয়া হয়ে যায়। মনে পড়ছে ইনার কথা। ইনা একজন রাশিয়ান নারী। প্রায় বছর কুড়ি আগে এক কালো মানুষকে বিয়ে করে এদেশে এসেছিলো। একটি মেয়ে আছে তাদের। তবে সেই মানুষটি আর সাথে নেই। এখন ৫৫বছরের ইনা আমাদের আবুজা অফিসের একমাত্র কর্মী। বিরাট অফিসে ইনা ছাড়া আছে একজন সাফাই কর্মী ও তিন জন নিরাপত্তা কর্মী। বললাম, ভয় করেনা তোমার?

ভয় পেয়ে কি লাভ? এখনতো আমি নাইজেরিয়ান হয়ে গেছি। এখানে লুট হয় নরম মানুষরা। সে যদি বোঝে তুমিও তাকে ঘুষি মারতে পারো, তবে আসবে না। তাই সব সময় রোয়াব নিয়েই চলতে হবে এখানে। একদিন এক অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে গাড়ির অপেক্ষা করছি। হঠাৎ একজন এসে বললে, I need your mobile. এতটুকু না ভেবেই বললাম, you need it? Great, take it. এমনটা কখনোই সে ভাবেনি দেখলাম। ঘাবড়ে গিয়ে পালিয়ে গেলো।

তবে সবাই যে সেভাবেই পালাবে এমন কিন্তু নয় আদৌ। দেশের উত্তরপূর্ব  মাইদুগুরি (Maiduguri) প্রদেশে এখনও কিছু অঞ্চলে রয়েছে বোকো হারাম। পোর্ট হারকোর্ট (Port Harcourt) দেশের দক্ষিণপূর্ব অঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য বন্দর। নাইজেরিয়ার অধিকাংশ তেল ভান্ডার রয়েছে এই অঞ্চলে। সারা বিশ্বের তেল কোম্পানি গুলো ঘাঁটি গেড়েছে এই অঞ্চলে। তার সঙ্গে ঘাঁটি গেড়েছে লাগামহীন অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়। একজন বলল, মুক্তিপণের টাকা এতটাই বেশি হয় যে সঠিক একজন বিদেশিকে অপহরণ করতে পারলে অপহরণকারীরা সারা জীবন কাটাতে পারে নিশ্চিন্তে।

তবে তেলের দাম কমে যাওয়াতে তারা এখন বেশ চাপেই আছে।(চলবে)

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com