আজ আমরা তাঁদের হারিয়েছিলাম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অবরুদ্ধ ঢাকা শহর। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাস চলছে। পাক সেনাদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ চলছে মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় বাহিনীর। ঢাকা শহরের কেন্দ্রে একের পর এক হামলা চালিয়ে পাকিস্তানী সৈন্যদের অবস্থান তছনছ করে দিচ্ছে গেরিলারা। পরিস্থিতি যেন কন্ঠরোধ করে আছে নগরে বেঁচে থাকা মানুষগুলোর। সেই ডিসেম্বর মাসের অন্তিমে এসে ঢাকা শহরের বেশ কিছু বাড়ির সামনে এসে থামে মাইক্রোবাস। দরজার বাইরে এসে দাঁড়ায় মুখে কাপড় বাঁধা সশস্ত্র ব্যক্তিরা। তারা সবাই তৎকালীন রাজাকার ও আল-বদর নামে আধা বাহিনীর সদস্য। বাড়ি বাড়ি ঢুকে তারা তুলে নিয়ে যায় বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে। তারপর সেই মানুষেরা আর কখনোই বাড়িতে ফিরে আসেন নি। দেশ স্বাধীন হলে তাদের লাশ আত্নীয় স্বজনরা সনাক্ত করেন  বধ্যভূমিতে। তারাই ছিলেন বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজের অংশ। তারাই ছিলেন এদেশের শিক্ষা, সংস্কিৃতির মেধাবী মানুষ,জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বরেণ্য শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিক।

১৪ ডিসেম্বর পাক বাহিনী ও তাদের দোসররা পূর্ব পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ছক অনুযায়ী  এই দেশকে, জাতিকে মেধাহীন ও পঙ্গু করতে দেশের এই বরেণ্য সব ব্যক্তিদের রাতের অন্ধকারে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করে।

বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে প্রতিবছর এই দিবসটি জাতি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করে। এ বছরও দিবসটি পালনে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও নিয়েছে পৃথক পৃথক কর্মসূচি।

মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি, পাকিস্তানী বাহিনীর পক্ষে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনায় একসঙ্গেই বুদ্ধিজীবীদেরহত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পাকিস্তানী সেনারা অপারেশন চলাকালীন সময়ে খুঁজেখুঁজে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে ২৫শে মার্চের রাতেই হত্যা করা হয়। তবে, পরিকল্পিত হত্যার ব্যাপক অংশটি ঘটে যুদ্ধ শেষ হবার মাত্র কয়েকদিন আগে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং তাদের প্রশিক্ষিত আধা-সামরিক বাহিনী আল-বদর এবংআল-শামস বাহিনী একটি তালিকা তৈরি করে, যেখানে এই সব স্বাধীনতাকামী বুদ্ধিজীবীদের নাম অন্তর্ভূক্ত করা হয়।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত বঙ্গভবন থেকে সেই কুখ্যাত জেনারেল ফরমান আলীর স্বহস্তে লিখিত ডায়েরী পাওয়া যায় যাতে অনেক নিহত ও জীবিত বুদ্ধিজীবীর নাম লেখা ছিলো।

আইয়ুব খানের শাসন আমলের তথ্য সচিব আলতাফ গওহরের এক সাক্ষাৎকার থেকে পরে জানা যায়, ফরমান আলীর সেই তালিকায় তার বন্ধু বাংলাদেশের কবি সানাউল হকের নাম ছিলো। আলতাফ গওহরের অনুরোধে রাও ফরমান আলি তার ডায়েরীর লিস্ট থেকে সানাউল হকের নাম কেটে দেন।  সেই অপারেশন চালানোর জন্য আলবদরদের গাড়ির ব্যবস্থা তিনিই করেছিলেন। সেই উদ্ধার করা ডায়েরিতে এরকম নোট পাওয়া যায়। এছাড়া তার ডায়েরীতে হেইট ও ডুসপিক নামে দুজন আমেরিকান নাগরিকের কথা পাওয়া যায়। এদের নামের পাশে ইউএসএ এবং ডিজিআইএস লেখা ছিলো। এর মধ্যে হেইট ১৯৫৩ সাল থেকে সামরিক গোয়েন্দাবাহিনীতে যুক্ত ছিলো এবং ডুসপিক ছিলো সিআইএ এজেন্ট। এ কারণে সন্দেহ করা হয়ে থাকে, পুরো ঘটনার পরিকল্পনায় সিআইএ’র ভূমিকা ছিলো।

বুদ্ধিজীবী নিধন তদন্ত কমিশন প্রণীত একটি দলিল থেকে জানা গেছে, বুদ্ধিজীবী হত্যায় যারা ঘৃণ্য ভূমিকা রাখে তাদের মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার রাজা, ব্রিগেডিয়ার আসলাম, ক্যাপ্টেন তারেক, কর্নেল তাজ , কর্নেল তাহের (পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তা), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইন, ড. মোহর আলী, আল বদরের এবিএম খালেক মজুমদার, আশরাফুজ্জামান ও সাংবাদিক চৌধুরী মাইনুদ্দিন। এদের নেতৃত্ব দেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী।

হেনরি কিসিঞ্জার ও ভুট্টো

বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটির প্রধান শহীদ জহির রায়হান বলেছিলেন, এরা নির্ভুলভাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রমনা বুদ্ধিজীবীদেরকে বাছাই করে আঘাত হেনেছে।পরে জহির রায়হান  নিখোঁজ বুদ্ধিজীবী অগ্রজ শহীদুল্লাহ কায়সারকে ঢাকার মিরপুরে খুঁজতে গিয়ে শহীদ হন ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি।

১৪ ডিসেম্বর দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারানোর দিন। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিন। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরের হত্যাকান্ড ছিলো পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম বর্বরতম ঘটনা যা বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী মানুষকে স্তম্ভিত করেছিলো। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের পর ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে বুদ্ধিজীবীদের লাশ ফেলে রেখে যায়।

১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পরপরই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিকট আত্মীয়রা মিরপুর ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে তাদের গলিত ও ক্ষত বিক্ষত লাশ খুঁজে পায়। বুদ্ধিজীবীদের লাশে ছিলো আঘাতের চিহ্ন। চোখ, হাত-পা ছিলো বাঁধা। কারো কারো শরীরে ছিলো একাধিক গুলির চিহ্ন। অনেককে হত্যা করা হয়েছিলো ধারালো অস্ত্র দিয়ে। লাশের ক্ষত চিহ্নের কারণে অনেকেই প্রিয়জনের মৃতদেহ শনাক্ত করতে পারেননি।

১৯৭২ সালে জাতীয়ভাবে প্রকাশিত বুদ্ধিজীবী দিবসের সঙ্কলন, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও আন্তর্জাতিক নিউজ ম্যাগাজিন ‘নিউজ উইক’-এর সাংবাদিক নিকোলাস টমালিনের লেখা থেকে জানা গেছে, শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা মোট ১ হাজার ৭০ জন।

হানাদারদের এদেশীয় দোসর আলবদর বাহিনী দেশের যেসব শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করে এর কিছু বর্ণনা পাওয়া গেছে রমনা থানায় দায়ের করা বুদ্ধিজীবী হত্যা মামলার বাদী ফরিদা বানুর মামলা থেকে। তিনি এজাহারে বলেছেন, তার ভাই গিয়াসউদ্দিন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ও মোহসীন হলের হাউস টিউটর ছিলেন। ১৪ ডিসেম্বর সকালে ঘাতকরা মোহসীন হল সংলগ্ন বাসায় গিয়ে তাকে না পেয়ে হলে যায়। হলের সামনে খুঁজে পায় তাকে। হলের দারোয়ান আবদুর রহিমের গামছা দিয়ে প্রথমে তার চোখ বাঁধে। পরে ইপিআরটিসির একটি মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এরপর আর ফিরে আসেননি তিনি।

ঘাতকরা অন্যান্য হাউস টিউটরের বাসায়ও যায়। এসময় ওই হলের ছাত্র ছিলেন বাংলা একাডেমীর সাবেক মহাপরিচালক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। তিনি পুরো ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। পরে তারা জানতে পারেন গিয়াসউদ্দিন আহমেদ ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে ড. মো. মুর্তজা, ড. আবুল খায়ের, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক সিরাজুল হক ও ড. সন্তোষ ভট্টাচার্যসহ আরো অনেককে ধরে নিয়ে গেছে আল বদররা।

শহীদ বুদ্ধিজীবী মো. মুর্তজা ও সিরাজুল হকের ছেলে এনামুল হক অপহরণকারীদের দু’জনকে চিনতে পারেন। তারা হলেন চৌধুরী মাইনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান। দু’জনই তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ একাত্তর ওয়েব সাইট

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com