আজও ডাকে ফেরিওয়ালা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

কারো হয়তো মনে আছে। বেশীরভাগেরই মনে থাকার কথা নয়। এই শহরে একদা সকালবেলা মাথায় কাঠের বাক্স চাপিয়ে তাতে মিষ্টি আর লুচি নিয়ে রাস্তায় ঘুরতো ফেরিওয়ালা। কেউ বুকের কাছে গামছা দিয়ে বাঁধা ট্রেতে চিনি দিয়ে তৈরী রঙীন ছোট ছোট গ্লাস আর খর্বাকৃতির আম গাছ সাজিয়ে আসতো বিক্রি করতে। আসতো কটকটিওয়ালা।
পেছন ফিরে তাকালে এখন রূপকথার গল্পের মতো মনে হয়। ধূসর হয়ে আসা কিছু দৃশ্য, ক্রমশ মুছে যাচ্ছে, চাপা পড়ে যাচ্ছে। একদা এই শহরে ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাক এখন প্রায় ম্রিয়মান বললেই চলে। ঝকঝকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিপণী বিতান আর স্বাস্থ্যকর খাবার এখন নাগরিকদের পছন্দের তালিকায়। সেই ম্লানমুখ ফেরিওয়ালা আর তাদের বিচিত্র ডাক আজ ফেরারী।
কটকটি যে একটি খাবারের নাম হতে পারে সেটা আজো আমার কাছে এক অপার বিষ্ময়। আজো জানা হয়নি খয়ের রঙের সেই বস্তুটি ঠিক কী দিয়ে তৈরী হতো। অদ্ভূত ভাবে সিনেমার ফিল্মের ফেলে দেয়া ক্যানের মধ্যে বাস করতো সেই তীব্র আকর্ষণীয় বস্তুটি। এখন বুঝতে পারি, চিনি দিয়ে বেশী করে জাল দেয়ায় সেটা হতো ভীষণ শক্ত। মুখে ঢুকিয়ে চিবাতে গেলে খটমট করে লাগতো। তাই বোধ হয় নাম ছিলো কটকটি। এই খাবারের বিনিময় প্রথাটা ছিলো আরো অদ্ভূত। সাধারণত বাড়ির ভাঙ্গা কাচের জিনিশ, ছেঁড়া কাপড় অথবা রাজ্যের বাতিল মাল  দিয়ে কিনতে হতো কটকটি।খুব গোপনে, অভিবাবকদের নজর এড়িয়ে জমিয়ে রাখতাম ভাঙ্গা, বাতিল বস্তু। অপেক্ষা, কবে আসবে কটকটিওয়ালা। সেই ক্যান ভর্তি কটকটির মালিক অবশ্য ভীষণ হৃদয়হীন হতো। একগাদা বাতিল পণ্য দেয়ার পরেও কৃপণের মতো সামান্য একটু কটকটি ভেঙ্গে দিয়ে যেত। কচকটিওয়ালার হাতে কোন ঘন্টা থাকতো না। কিন্তু ঘন্টা থাকতো সেই চিনির গ্লাস বিক্রেতার কাছে। পেতলের তৈরী ঘন্টার আওয়াজ তখন যে কী মধুর বলে মনে হতো!বালক বয়সে চিনি আর রঙ গোলা দিয়ে তৈরী সেই ছোট ছোট রঙীন গ্লাস ছিল রোমাঞ্চ জাগানো এক বস্তু। যতদূর মনে পড়ে একটা গ্লাস পাওয়া যেতো চার আনা অর্থাৎ পঁচিশ পয়সায়। তার সেই কাঠের ট্রেতে সাজানো আম গাছের মডেলটার মূল্য ছিলো আরো বেশী। সম্ভবত এক টাকা পঁচিশ পয়সা। অত টাকা তখন জোগাড় করা আমাদের জন্য হিমালয় জয় করার সমান ছিলো।
এখনো মনে আছে, সেই কাঠের বাক্সের মিষ্টির কথা। সাদা মিষ্টির গায়ে চিনি ছড়ানো থাকতো। সঙ্গে লুচি। বহুকাল আগে ছুটির দিনের শহরে এরকম মিষ্টিওয়ালার দেখা মিলতো। দেখা মিলতো কুলফি বরফের। লাল রঙের কাপড়ে ঢাকা ঝুড়ি মাথায় চৈত্রের খরশান দুপুরে তারা ঘুরতো পাড়ায় পাড়ায়। হাঁক দিতো ‘‘এই কুলপি মালাই’। তেকোণা এনামেলের চোঙ্গা, মাথায় পড়ানো রাবারের ক্যাপ। খুলে ফেললে ভেতরে অমৃতের মতো ঠান্ডা কুলফি। সেই কুলফির ওপরে আবার ছড়ানো থাকতো মূল্যবান বাদাম। এই শহরে হারিয়ে যাওয়া আরেক মানুষ লেইসফিতা বিক্রির মানুষটি। তার কাঁধে সাদা কাপড়ে বাঁধা বিশাল গাটরির মাঝে কী পাওয়া যেতো না! সেফটিপিন থেকে শুরু করে কাপড়-সবই মজুদ থাকতো তার ভান্ডারে। দুপুরবেলা দেখতাম পাড়ার গৃহিনীরা ভীড় করে আছে সেই লেইসফিতাওয়ালার সামনে। এক সময়ে কাঁধে বাঁশের ঝুড়িতে করে অ্যালমুনিয়ামের হাড়ি নিয়ে ফেরিওয়ালা আসতো। ভাঙ্গা হাঁড়ি আর পুরনো জামাকাপড়ের বদলে দিয়ে যেতো নতুন হাঁড়ি আর সরা। তাকে ঘিরে বাড়ির মহিলাদের দরদামের প্রতিযোগিতা চলতো। তারা ডাকতো ‘‘এই দিবেন টুটা ফাটা হাড়ি পাতিল।এরকম কাঁধের ওপর বিশাল বাঁশের দুই মাথায় পাত্র বসিয়ে সকালবেলা দুধ নিয়ে আসতো দুধওয়ালা। সাদা দুধের ওপর ভেসে থাকতো সবুজ কচুরিপানা।
বিচিত্র সব মানুষ আর বিচিত্র ছিলো তাদের ডাক। বেদেরা দল বেঁধে আসতো সাপের খেলা দেখাতে। মেয়েদের কন্ঠে ডাক শোনা যেতো ‘‘সাপের খেলা দেখাই, বেজীর খেলা দেখাই।’’১৯৭০ সালে মাঠের ওপর ঝাঁপি থেকে বের হওয়া সাপের পিচ্ছিল শরীর দেখে ভয়ে কেঁপে উঠেছিলাম। চমকে গিয়েছিলাম টিনের বাক্সের ফুটায় চোখ রেখে নানা রকমের ছবি দেখে। লোকটা এক হাতে একটা প্যাডেল মতো জিনিস ঘোরাতে ঘোরাতে বলছিলো-‘‘এই যে ঢাকা চইলা গেলো, কী সোন্দর দেখা গেলো।’’  এক বাক্সের ভেতরে কল ঘুরিয়ে এমন ছবি দেখা ছিল ভীষণ রোমাঞ্চের। বড় বাক্স মাথায় সেই ফেরিওয়ালা মুভি ডাউন লোড আর স্ট্রিমিংয়ের স্রোতে কোথায় ভেসে গেছে কে জানে?
স্মৃতির এইসব ফেরিওয়ালাদের গল্প আসলে অফুরান। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই কেনা বেচার যুগে হারিয়ে গেছে সেইসব সাধারণ ফেরিওয়ালারা শহর থেকে। তাদের জায়গা দখল করে নিয়েছে দানবীয় সব শপিং কমপ্লেক্স, ফুডকোর্ট আর বায়ুভর্তি ঠোঙ্গার খাবার।বদলে গেছে ক্রেতাদের ধরণ।  তবু আজো মনের ভেতর থেকে শুনতে পাই সেইসব ফেরিওয়ালার ডাক। হারানো শহরে ডাকে ফেরিওয়ালা। ডেকে ওঠে অদ্ভুত গলায় ‘এই ঘটি গরম’। ডাকে কে জানে?

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com