আজো জীবন্ত পাবলো পিকাসোর ‘গের্নিকা’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পাবলো পিকাসো

স্পেনের রিপাবলিকান সরকারের বিরুদ্ধে ফ্রাঙ্কো আর হিটলারের সম্মিলিত আক্রমণের জবাব নিজের অস্ত্রেই দেবেন বলে ঠিক করেছিলেন পিকাসো, পাবলো পিকাসো। আর তাই প্যারিসে বসে হাতে তুলে নিলেন তুলি আর প্যালেট। আঁকতে শুরু করলেন সেই অনন্য চিত্রকর্ম ‘গের্নিকা। ২৫.৬ বাই ১১.৫ ফুটের বিশাল ক্যানভাসে গর্জে উঠল সাদা-কালোর অতুলনীয় কিউবিজম। যুদ্ধের বিরুদ্ধে, নির্বিচার হত্যার বিরুদ্ধে এক ছবি আঁকিয়ের হুঙ্কার।

এই ছবিটি পিকাসোর স্বদেশে প্রদর্শনীর জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে বহু বছর। ১৯৭৫ সালে ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুর পর ‘গের্নিকা’ফিরেছিল স্বদেশে। গোটা পৃথিবী জুড়েই এই ছবি আজো যেন প্রতিবাদের এক হাতিয়ার হয়ে আছে। পোস্টারে প্রদর্শনীতে, এই যুদ্ধবিরোধী শিল্পকর্ম প্রতিবাদী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সেই হত্যাকান্ডের পর আশি বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। ছবিটিও পারি দিয়েছে দীর্ঘ পথ। গত এপ্রিলে উদযাপিত হয়েছে যুগলবন্দী ঘটনার ৮০ বছর।

জ্বলছে গের্নিকা শহর

কোথায় ঘটেছিল সেই নির্বিচারে হত্যালীলার ঘটনাটি? ঘটেছিল শিল্পীর মাতৃভূমি স্পেনে। সেখানকার বাস্ক প্রদেশের এক ছোট্ট, ছবির মতো সুন্দর শহর গের্নিকা। ১৯৩৭ সালের ২৬ এপ্রিল সেখানে ছিল হাটবার। তাই গের্নিকায় সে দিন জনসমাগম বেশি। কোনও পূর্বলক্ষণ, হুঁশিয়ারি বা হুমকি ছিল না। হঠাৎ বিকেল চারটে নাগাদ আকাশে উড়ে এল একটা প্লেন।পনেরো মিনিটের মধ্যে পর পর তিনটে বিমান। সব ক’টাই জার্মানি ও ইতালির। হিটলার ও মুসোলিনির যৌথ অভিযানে আকাশ থেকে নেমে এল একের পর এক বোমা। শহর জ্বলছে, তারই মধ্যে যাঁরা পালাতে চেষ্টা করেছিলেন হিটলারের নাৎসী বাহিনীর বর্বর মেশিনগান তাদের থামিয়ে দিয়েছিল সারা জীবনের জন্য। স্পেনে গৃহযুদ্ধ আর প্রতিবাদকে বুটের তলায় পিষে খতম করতেই হিটলার আর মুসোলিনির বন্ধু শাসক ফ্রাঙ্কোর সর্বনাশা আয়োজন। হিটলার আর মুসোলিনিও চেয়েছিলো  ফ্রাঙ্কোর স্বৈরাচারী শানসকে নিষ্কন্টক করতে মানুষ হত্যা করে।

 নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই ছিল বেশি। গের্নিকার অধিকাংশ পুরুষই তখন কাজের সূত্রে বাইরে। তখন তো ইন্টারনেট ছিলো না তাই বাইরের দুনিয়ায় খবর পৌঁছতে তিন-চার দিন লেগে গেল। দিকে দিকে উঠলো ধিক্কার আর প্রতিবাদের ঝড়। ১৯৩৭-এর ১ মে পথে নামল প্যারিস শহর, প্রতিবাদের মুষ্টি আকাশে তোলা মানুষের মিছিল প্রতিবাদ জানালো। সেই প্যারিসেই ওই ধ্বংসলীলার খবর পান পাবলো রুইজ পিকাসো।

সাংবাদিক জর্জ স্টিয়ার-এর কাছে হত্যালীলার বিবরণ শুনে টালমাটাল হয়ে গিয়েছিলেন পিকাসো। এই ঘটনার কিছুদিন আগে স্পেনের রিপাবলিকান সরকারের জন্য একটি কাজ হাতে নিয়েছিলেন শিল্পী। প্যারিস বিশ্ব-মেলায় স্পেনীয় গ্যালারির জন্য তৈরী করবেন একটি ম্যুরাল। কিন্তু গের্নিকার ঘটনাটা যেন থাকে এক ধাক্কায় ভিন্ন এক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে নিক্ষেপ করলো। বিশাল ক্যানভাসে ছবিটা আঁকতে শুরু করে দিলেন তিনি। খুব সচেতন ভাবেই এ ছবিতে কোন রঙের ব্যবহার থাকলো না। যেন এক ধূসর, ভয়ঙ্কর প্রেক্ষপটকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার আয়োজন। ছবিটির প্রথম প্রদর্শনীর পরে স্পষ্ট ব্যাখ্যাও দেন নি শিল্পী। শুধু জানালেন, ক্রোধে উন্মত্ত ষাঁড়, যন্ত্রণাকাতর ঘোড়া, মৃত সন্তান কোলে মা বা মুমূর্ষু সৈনিকের হাতে ধরা তলোয়ারে ফোটা ফুল— এ সবের ব্যাখ্যা যে-যার মতো করে ভেবে নিক। তিনি কোনও ধারণা চাপিয়ে দিতে চান না।

গের্নিকা বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রদর্শিত হলেও স্পেন তার কাছে ব্রাত্যই ছিল। পিকাসো চেয়েছিলেন, যত দিন না স্পেনে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে, তত দিন গের্নিকা সেখানে যাবে না। তাই তাঁর ইচ্ছাতেই গের্নিকার সযত্ন ঠাঁই হয় নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট-এ। পরে অবশ্য ১৯৭৩-এ পিকাসো এবং ’৭৫-এ ফ্র্যাঙ্কোর মৃত্যুর পরে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ১৯৮১ সালে স্পেন ছবিটিকে হাতে পায়। প্রদর্শনের সময়ে বিভিন্ন জায়গায় বেশ কয়েক বার আক্রান্তও হয়েছিল গের্নিকা। স্পেনে নিয়ে আসার পরে তাই ছবিটিকে বোমা ও বুলেট-নিরোধক কাচের ভিতরে রাখা হয়।

পিকাসো চলে গিয়েছেন, তাঁর গের্নিকারও বয়স বেড়েছে। কিন্তু চিত্রকর্মের সেই ধার যেন অরো বেড়েছে। ষাটের দশকে ভিয়েতনামের মাই লাই তে ঘটেছিল আরেক গণহত্যা। মার্কিন বোমারু বিমান আকাশ থেকে বোমা ফেলে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল দুই গ্রামকে, প্রায় সাড়ে ৫০০ হতাহতের মধ্যে নারী, শিশুরাও রেহাই পায়নি। তখন আমেরিকায় যুদ্ধবিরোধী মিছিলের অগ্রভাগে ছিল গের্নিকার পোস্টার।

একুশ শতকও পিছিয়ে নেই। ২০০৩ সালে ঘটনা। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে ইরাক আক্রমণের ‘আশু প্রয়োজন’ সম্পর্কে বুঝিয়ে বলবেন তৎকালীন মার্কিন বিদেশসচিব কলিন পাওয়েল ও রাষ্ট্রপুঞ্জে স্থায়ী মার্কিন প্রতিনিধি জন নেগ্রোপন্ট। তাঁদের বসার জায়গার ঠিক পিছনেই দেওয়াল জুড়ে গের্নিকা। আসল নয়, ‘রেপ্লিকা’। কিন্তু মার্কিন সরকারের কানে সে খবর যেতেই তারা নড়েচড়ে বসলো। এরকম কান্ড হলে তো তাদের চলবে না। যে ঘরে যুদ্ধের পক্ষে কথা বলা হবে সেখানে গের্নিকা থাকে কী করে! অনুরোধের ছদ্মবেশে বুশ প্রশাসনের জরুরি নির্দেশ গেল রাষ্ট্রপুঞ্জের কর্তাদের কাছে। ঠিক হলো, দেওয়ালে টাঙানো ছবিটাকে ঢেকে দিতে হবে। যেমন বলা তেমন কাজ। নীল পরদার আড়ালে চলে গেল গের্নিকা। পাওয়েলরা বক্তৃতা করে চলে গেলেন ঠিকই, কিন্তু তারপর সংবাদমাধ্যম নীল পর্দার রহস্য ভেদ করে হইহই ফেলে দিল বিশ্ব জুড়ে। আড়াল করেও গের্নিকার মুখ ঢাকা গেল না।

দ্বিতীয় ঘটনা গত বছরের। আলেপ্পো শহরের আল কুদ হাসপাতালে পর পর চার বার বিমান হানা, গুঁড়িয়ে গেল হাসপাতাল থেকে মসজিদ, অনেক কিছুই। আমেরিকার বক্তব্য, সিরিয়ার সরকারি সেনা হামলা চালিয়েছে। রাশিয়ার বক্তব্য, আমেরিকার মদতে সিরিয়ার কিছু বিদ্রোহী সে দিন রাসায়নিক অস্ত্রে আলেপ্পোর জনজীবন ধ্বস্ত করেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জে ফ্রান্সের দূত রোজারিও পেরো সে দিনও টেনে আনলেন পিকাসোর ছবিকে, ‘স্পেনের যুদ্ধে গের্নিকা যা ছিল, সিরিয়ার যুদ্ধে আজ আলেপ্পোও ঠিক তাই। মানুষের ট্রাজেডি, সভ্যতার কৃষ্ণগহ্বর।’ ছবিটা আজও যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়।

পিকাসো নিজে সেটাই চেয়েছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় প্যারিসে তখন নাৎসিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ জোর কদমে। শিল্পবেত্তা এক নাৎসি অফিসার ছবিটা দেখতে  এসে প্রশ্ন করেছিলেন পিকাসোকে, ‘আপনারই সৃষ্টি, না?’

এক মুহূর্ত চুপ করে যান নি পিকাসো। বলেছিলেন ‘না, আমার নয়। সত্যিটা অন্য। ওটা আপনাদেরই সৃষ্টি।’

হত্যার খুঁটিনাটি আজ ম্লান, কিন্তু চিত্রকলার প্রতিবাদ আজও জীবন্ত, আজো জীবন্ত পাবলো পিকাসোর ‘গের্নিকা’।

আজিজ রহমান
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com