আকাশ-মেঘ-মন এবং ষড়ঋতু

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নার্গিস আক্তার

 সকাল দুপুর সন্ধ্যায় আকাশ তার রূপ বদলায়। বদলায় রঙ। এই বদল ঋতুতে ঋতুতে। মেঘও তার রঙ বদলায়! তাইতো মেঘের কতো যে রূপ, কতো যে রঙ। আকাশ আর মেঘের মতো মানুষের মনও হয় নানা বর্ণের, নানা রূপের, ঠিক ঋতুগুলোর মতোই। কোনো কোনো মানুষ গ্রীষ্মের মতো খটখটে স্বভাবের, রুক্ষ্ম আর প্রখর রোদের মতোই তেজদীপ্ত। একরোখা এই মানুষগুলোর হৃদয় যেনো শুষ্ক মরুভূমি। অন্তর বেদনার্ত হলেও তার বহিঃপ্রকাশ নেই! আবেগ বিবর্জিত অথবা আবেগ থাকে সুপ্ত কিম্বা ঘুমন্ত! কেউ কেউ প্রচন্ড আবেগী, যেনো বর্ষা ঋতু! একটু ছোঁয়াতেই ঝড়ে পড়ে। তার মনের আকাশে এই মেঘ এই রোদ্দুর আবার অঝরে ঝরে বরিষণ। আমরা তাদের ছিঁচকাঁদুনে বলি।সাধারণত মেয়েদের মধ্যে বর্ষা ঋতুর স্বভাব স্পষ্ট। এরা অল্পে খুশি, অল্পে বেদনাময়ী আবার সব কিছুতেই আনন্দ খুঁজে নেবার ক্ষমতা রাখে। ভিজে ভিজে শীতল মনের মানুষ তারা শরতের আকাশের মতো স্বচ্ছ পরিষ্কার মনের মানুষ আছে। যারা খুব স্পষ্টভাষী, উচ্ছ্বল আর উজ্জ্বল মনের অধিকারী হয়ে থাকে। মন্দ নয়, ভালো কিছু ভেবেই তাদের দিন পার হয়ে যায়। তারা অন্যের প্রভাবে প্রভাবিত হয় না, প্রখর বিবেকবোধসম্পন্ন এই মানুষগুলো অতিমাত্রায় আত্মপ্রত্যয়ী যাদের উপর সহজেই অন্যজন আস্থা রাখতে পারে! তাদের আরো একটি চমৎকার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আছে। তারা তাদের চারপাশের মানুষের মনস্তত্ত্ব বিবেচনা করে আচরণ করবার চেষ্টা করে। আবেগের পাশাপাশি তারা বাস্তবববাদীও হয়! কিছুটা রহস্যময়তাও তাদের ঘিরে রাখে। সবকিছু মিলিয়ে সৃষ্টিশীল এই মানুষগুলো হয় আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। হেমন্তের শিশিরভেজা ভোরের মতোই কিছু মানুষ বড়ো বেশি স্নিগ্ধ! মমতা আর সততায় তাদের বিকল্প নেই। অন্যের কষ্ট তাদেরও ছুঁয়ে যায়! যাকে ভালোবাসে গভীরভাবেই বাসে। মনের রঙ বদলায় না নিমিষেই। অল্পতেই কারো উপর আস্থা হারায় না তারা। সহজেই বিশ্বাস করে যে কাউকে। ঠকবে কী জিতবে এ-ভাবনায় তারা সহসা কাতর হয় না। স্বল্পভাষী গভীর মনের এই মানুষগুলোর কাছে যে কোনো প্রয়োজনে আশ্রয় পাওয়া যাবে, সে বিশ্বাস থেকে অন্যরা তাদের কাছের মানুষ ভাবতে পারে। ভাবলেশহীন, রুক্ষ্ণ- শুষ্ক কিছু মানুষ কী নেই? তারা হাসে কম, কাঁদেও কম! তাদেরকে বড়ো বেশি রূঢ় মনে হয়। তারা ভালো নাকি মন্দ, কোমল নাকি কঠিন- কিছুই বুঝবার জো নেই। কারণ তারা অনেকটাই আবেগবিবর্জিত মানুষ! প্রখরবুদ্ধিদীপ্ত এই মানুষগুলো কর্মক্ষত্রে প্রায় শতভাগ সফল হয়, এ কারণে, তাদের মন উড়ু উড়ু চঞ্চল হয় না। একটা জায়গায় স্থির থাকে। প্রাণ-মন ঢেলে দেয় নিজ নিজ কাজে। সফলতা পালাবে কোথায়!! অভিব্যক্তিহীন এই মানুষগুলো এতোটাই নির্লিপ্ত প্রকৃতির হয় যে, তাদের আনন্দ বেদনাও বোঝবার উপায় থাকে না। অতিমাত্রায় বাস্তবাদী ব’লে তারা নিয়মের বাইরে এক কদমও ফেলে না। অন্যের উচ্ছ্বলতা তাদের মুগ্ধ করলেও দৃঢ়তার কারণে তারা সেই উচ্ছ্বলতায় অংশ নিতেে পারে না। সততাই অহংকার; এই বোধ তাদের গোটা এক জীবনকে চালিত করে। তারা বিতর্কের ঊর্ধ্বে ভালো মানুষ হিসেবেও স্বীকৃতি পায়। শীত ঋতু তাদের উপর পুরাই প্রভাব বিস্তার করে। সদা আনন্দে থাকতে চায়, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর থাকে তাদের হৃদগগন। এমন মানুষের সংখ্যাও কম তো নয়! প্রতিটি মুহুর্ত তারা উপভোগ করতে চায় তাদের সবটুকু দিয়ে! “পাছে লোকে কিছু বলে” কে তারা থোরাই কেয়ার করে! সংশয়-দ্বিধা-সংকোচ এ-সব কিছুর ঊর্ধ্বে তাদের ভাবনার জগত! এ-জীবন ক্ষণকালের, পৃথিবীর রুপ-রস-সুধা পান করে নাও-অনন্তের জন্যে অপেক্ষা না করে, এমন ভাবনার উতল হাওয়ায় মাতাল এই মানুষগুলো তো ঋতুরাজ বসন্তের মতোই। শিল্পবোধসম্পন্ন এই মানুষগুলোকে আনন্দ পাবার উৎস খুঁজে নিতে হয় না, আনন্দের উৎসরাই তাঁদের খুঁজে নেয়! তারা অনেকটাই আত্মকেন্দ্রিক হলেও তারুণ্যের প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। লাস্যময়, সদা হাস্যময়, আনন্দপিয়াসী আবার রহস্যে আবৃত কিছু মানুষ তো আছেই! তাদের রহস্য উন্মোচনে কারো কারো জীবন কেটে যায়। এরা বোধকরি সকল ঋতুর মিশেলে মিশ্র ঋতুর আদলে গড়া স্রষ্টার রহস্যময় এক সৃষ্টি। বড়ো কথা কেউ কারো মতো নয়। প্রতিটি মানুষের রয়েছে ভিন্ন সত্তা। ভিন্ন ব্যক্তিত্ব। এই ভিন্নতা মেনে নিয়েই যাপিত হোক আমাদের প্রতিদিনের জীবন।

ছবি: আনসার উদ্দিন খান পাঠান

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com