অসাধারণ সত্যজিৎ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সত্যজিৎ রায়ের ছিল ফটোগ্রাফিক মেমরি।কোন কিছুই ভুলতেন না। শোনা যায়, ১৯৫৩ সালের দিকে অজন্তা-ইলোরা দেখতে গিয়েছিলেন। সেই ভ্রমণের প্রায় কুড়ি বছর পরে গোয়েন্দা ফেলুদার ‘কৈলাশে কেলেঙ্কারি’ লিখতে গিয়ে অজন্তা ইলোরার প্রেক্ষাপট ব্যবহার করেছিলেন। সেটা ছিল হুবহু, ছবির মতো। আরেকবার এক জার্মান যুবক তার কাছে কোন একটি কাজে এসেছিল। কিছুদিন কলকাতায় থাকার পর অল্পদিনের জন্য সেই যুবক আমেরিকা যাবার সময় সত্যজিতের কাছে জানতে চেয়েছিল ফেরার সময় তাঁর জন্য কী আনবে। জবাবে সত্যজিৎ বলেছিলেন, বিটোফেনের একটি বিশেষ রেকর্ড নিয়ে আসতে। কিন্তুযেুবক তাঁর কাছে ওই বিশেষ পিসটির নাম জানতে চাইলে তিনি বলতে পারেন নি। মজার ব্যাপার হচ্ছে তারপর তিনি যুবককে দাঁড় করিয়ে রেখে ওই পিসটির নোটেশন হুবহু লিখে দিয়েছিলেন। 

এই অসাধারণ মানুষটি ছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক প্রবাদ পুরুষ এবং বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালকদের একজন। ছিলেন বাংলা কথাসাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। আজ  কলকাতা শহরে সাহিত্য ও শিল্পের জগতে খ্যাতনামা এক বাঙালি পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর জন্মদিনে প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

তাঁর পূর্বপুরুষের ভিটা ছিল বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া গ্রামে। বাবা ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপ্রতীম শিশু সাহিত্যিক সুকুমার রায়। তার পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়ও ছিলেন শিশু সাহিত্যিক, চিত্রবর, আলোকচিত্রী, ব্লক ডিজাইনার ও শিশুতোষ পত্রিকার সম্পাদক। তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। সত্যজিতের কর্মজীবন একজন বাণিজ্যিক চিত্রকর হিসেবে শুরু হলেও প্রথমে কলকাতায় ফরাসি চলচ্চিত্র নির্মাতা জঁ রনোয়ারের সাথে সাক্ষাৎ ও পরে লন্ডন শহরে সফররত অবস্থায় ইতালীয় নব্য বাস্তবতাবাদী ছবি লাদ্রি দি বিচিক্লেত্তে (ইতালীয় ভাষায় Ladri di biciclette, “বাইসাইকেল চোর”) দেখার পর তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্বুদ্ধ হন।

চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে সত্যজিৎ ছিলেন বহুমুখী এবং তাঁর কাজের পরিমাণ বিপুল। তিনি ৩৭টি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তাঁর নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র পথের পাঁচালী ১১টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে, যাদের মধ্যে অন্যতম ছিল কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাওয়া “শ্রেষ্ঠ মানব দলিল” (Best Human Documentary) পুরস্কারটি। পথের পাঁচালি, অপরাজিত ও অপুর সংসার – এই তিনটি চলচ্চিত্রকে একত্রে অপু ত্রয়ী বলা হয়, এবং এই চলচ্চিত্র-ত্রয়ী তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ বা ম্যাগনাম ওপাস হিসেবে বহুল স্বীকৃত। চলচ্চিত্র মাধ্যমে সত্যজিৎ চিত্রনাট্য রচনা, চরিত্রায়ন, সঙ্গীত স্বরলিপি রচনা, চিত্র গ্রহণ, শিল্প নির্দেশনা, সম্পাদনা, শিল্পী-কুশলীদের নামের তালিকা ও প্রচারণাপত্র নকশা করাসহ নানা কাজ করেছেন। চলচ্চিত্র নির্মাণের বাইরে তিনি ছিলেন একাধারে কল্পকাহিনী লেখক, প্রকাশক, চিত্রকর, গ্রাফিক নকশাবিদ ও চলচ্চিত্র সমালোচক। বর্ণময় কর্মজীবনে তিনি বহু পুরস্কার পেয়েছেন। তবে এগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হল ১৯৯২ সালে পাওয়া একাডেমি সম্মানসূচক পুরস্কারটি (অস্কার), যা তিনি সমগ্র কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে অর্জন করেন।

সত্যজিৎ রায় যেমন ছিলেন একজন বিখ্যাত বাঙালি ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক, তেমনই তিনি বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদানের জন্যও বিখ্যাত। তাঁর সৃষ্ট বিখ্যাত চরিত্র হল গোয়েন্দা ফেলুদা, বৈজ্ঞানিক প্রফেসর শঙ্কু ও তারিনীখুড়ো। তিনি এই তিনটি চরিত্র ছড়াও অনেক ছোট উপন্যাস ও ছোট গল্প রচনা করেছেন। তারঁ লেখার মূল লক্ষ্য ছিল কিশোর তরুণ পাঠক বর্গ, যদিও তিনি আবালবৃদ্ধবনিতার কাছে প্রিয় লেখক ছিলেন।

এক সময়ে পারিবারিক শিশু পত্রিকা ‘সন্দেশ’-এর সম্পাদনা করেছেন তিনি। পত্রিকাটি বাংলা ভাষায় শিশু সাহিত্যকে ঋদ্ধ করেছে দীর্ঘকাল ধরে। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৬-এর মধ্যে ভারত ছাড়াও মোট ১১টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পান এই অসাধারণ মাপের মানুষটি। অপরাজিত ছবির জন্য পেয়েছেন ভেনিস, সানফ্রান্সিসকো, বার্লিন, ডেনমার্কসহ ৫টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। তথ্যচিত্র ‘রবীন্দ্রনাথ’ ও ‘ইনার আই’ এবং টিভি চিত্র ‘সদগতি’নির্মাণ করেও দেশে-বিদেশে পেয়েছেন পুরস্কার। এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে তিনি পেয়েছেন বিশেষ সম্মান ও পুরস্কার। তিনি ভারত সরকারের নিকট থেকে ৪০টি পুরস্কার এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ৬০টি পুরস্কার লাভ করেন। এসবের মধ্যে রয়েছে দেশ-বিদেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের অনারারি ডক্টরেট ডিগ্রি, বিশ্বভারতীর ‘দেশিকোত্তম’, ‘দাদা সাহেব ফালকে’ পুরস্কার, ম্যাগসেসেই পুরস্কার, ফ্রান্সের ‘লিজিয়ন অব অনার’ (১৯৮৭), ‘ভারতরত্ন’ (১৯৯২), বিশেষ ‘অস্কার’ (১৯৯২) পুরস্কার ইত্যাদি। ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল কলকাতায় সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যু হয় ।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com