অণু গল্পঃ আলোকপুরীর ডাক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

স্মৃতি সাহা

নিউ ইয়র্ক থেকে: দীর্ঘ ধূসর শীতের শেষে বসন্ত আসছে এবার মৃদূপায়ে। আভরণহীন গাছগুলোতে অল্প অল্প ফুলের দেখা মিলছে। বাড়ির পিছনের আপেল গাছটাতে হালকা গোলাপী ফুল ছন্দ তুলছে খুব ধীর লয়ে। কিচেনের জানালা দিয়ে নবনী একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ফুলগুলোর দিকে। প্রথম বসন্তে বাতাসের অবিরাম শীতলতা মনকেও শীতল আর রঙহীন করে দেয়। এই শীতল মনেও আপেল ফুলগুলো রঙ ঢেলে দেয় যত্ন করে। তবে আজ নবনীর মন খুব ভালো। বছরের শুরুতেই গ্রীনকার্ড পেয়ে লিগ্যাল হয়েছে আমেরিকায়। আর গ্রীনকার্ড পেয়েই সব রকম প্রস্তুতি শেষ করেছে স্বেচ্ছা বনবাসের অবসান ঘটানোর। বনবাসই তো! প্রায় তের বছর আগে ৬ বছরের তিতিরকে সঙ্গে নিয়ে ঘর ছেড়েছিল অজানার উদ্দেশ্যে। সেসময় পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে নবনী বাধ্য হয়েছিল প্রাণের দেশ ছেড়ে আসতে। অনিমেষ মারা যাবার পর তিতির খুব মানসিকভাবে অসুস্থ পড়ে। সব জায়গায় বাবাকে খুঁজত। এজন্য ডাক্তার আর পরিবারের সবার পরামর্শে তিতিরকে নিয়ে আমেরিকায় দুঃসম্পর্কের প্রবাসী ছোটবোনের কাছে ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে চলে আসে সে। সেই শুরু দেশ থেকে অনেকদূরে প্রাণহীন জীবনযাপন। এখন তিতির কলেজে পড়ে। দেশের সবটা ভুলে বেশ মানিয়ে নিয়েছে আমেরিকাতে। তাই এবার নবনী দেশে ফিরবে। প্রাণের দেশ, সোনার দেশ। সেই ফেলে আসা অজস্র সোনার দিন। সেই যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অনিমেষের সঙ্গে বেইলি রোডে মহিলার সমিতির নাটক, পহেলা বৈশাখে লাল-সাদা শাড়ি আর বেণীতে বেলীফুলের মালা, যশোরে সেগুনে ঘেরা নিজের বাড়ি, সকালে মায়ের হাতের আতপ চালের ঘি-ভাত, নিমফুলের শুভ্রতায় টিয়ে পাখির অহর্নিশ কিচিরমিচির, স্কুলের পাশে ছোট্ট পুকুরে বেগুনী কচুরিপানার ফুল সব যেন উদ্বাত্ত আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। এগুলো ভাবতে ভাবতেই মনটা একটু হু হু করে ওঠে মায়ের জন্য। মা আজ ২ বছর হলো মারা গেছে। মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে নবনী ছটফট করেছে এখানে কিন্তু ছুটে যেতে পারে নি মায়ের কাছে। আর একমাত্র মেয়েকে শেষ সময় কাছে না পেয়ে মনোকষ্ট নিয়েই মা চলে গেছে। এবার দেশে গিয়ে নবনী সব কিছুতেই মা কে খুঁজে ফিরবে। অবশেষে তের বছরের অপেক্ষার অবসান।

গন্ধ মেশানো নিজের দেশের মাটিতে। বুকভরে নিশ্বাস নিল মমতামাখা বাতাসে। এয়ারপোর্ট থেকে ভাইয়ের বাড়ি যাওয়া অব্দি দু’চোখ জুড়ালো কৃষ্ণচূড়ার লালে। দেশ যেন লাল সবুজে বরণডালা সাজিয়েছে নবনীর আগমনে। একটু বিশ্রাম নিয়েই ভাইয়ের মেয়েকে নিয়ে নবনী বেরিয়ে পড়লো। টি এস সি, কার্জন হল, শাহবাগ,আজিজ সুপার মার্কেট, বেইলী রোড সব জায়গায় স্মৃতি হাতড়ে বেড়ায়। অনেক কিছুই পাল্টে গেছে তবুও জায়গাগুলো এখনো বড় আপন। ঢাকার পাট চুকিয়ে নবনী ফিরতে চাইলো যশোর। যে জায়গার সঙ্গে নবনীর নাড়ির সম্পর্ক। যশোর যাবার পথটুকু যেন সবুজে মোড়ানো। রাস্তার দু’ধারে সদ্য মাটিফুঁড়ে ওঠা মাঠের পর মাঠ সবুজ ধানের ঐক্যতান। কোথাও আবার ছোট ছোট বিল, রোদে ঝলমল। বাবার সঙ্গে বিলে জাল ফেলছে কোনো ষোড়শ। মাঠের পাশে বটগাছের ছায়ার শরীর জুড়ায় কৃষক। আর সারিবাঁধা কলাগাছের দেয়াল টপকে চোখ কৃষাণীর হেঁসেলে। শুকনো পাতার আগুনে উঠোনে পঞ্চব্যঞ্জনের আয়োজন। দু’চোখ ভরে নবনী দেখে নিচ্ছিল অবিরাম প্রাণের এই আয়োজন। এত প্রাণপ্রাচুর্য আর কোথাও আছে কিনা নবনী সন্দিহান।

সব প্রাণপ্রাচুর্য কোচড়ভর্তি করে নবনী এসে দাঁড়ায় মা আর স্বজনহীন নিজের বাড়িতে। মৃদূপায়ে এসে দাঁড়ায় নিমফুল ছড়ানো উঠোনে। এই নিমগাছের ছায়ায় মা বেলা মাপতো। গাছের ছায়া মায়ের রান্নাঘরের দুয়ারে পৌঁছুলে মা নবনীকে বলতো স্কুলে যাবার বেলা হয়েছে। দ্বিপ্রহরে সেই ছায়া এখন উঠোন পেড়িয়ে বৈঠকখানা ছুঁয়েছে। এখনো অজস্র দিনযাপনের খেরোখাতা যেন নিমের সবুজ পাতা। হাত দিয়ে ছুয়ে দেখে দাদুর লাগানো নিমগাছ। যত্নহীন বাড়িটি যেন আচমকা জেগে উঠেছে। পাতাছড়া উঠোন যেন মায়ার নিমগ্ন আধার। নবনী হাত দিয়ে মাটি ছোঁয়। হাতে জড়ানো ধুলোতে খুঁজতে থাকে মা, দাদু হারিয়ে যাওয়া আরোও কিছু বন্ধু স্বজন আর হারিয়ে যাওয়া না দেখা তের বছর। উঠোন পেরিয়ে মায়ের রান্নাঘর ডিঙ্গিয়ে, একটা পুরাতন কাঠের দরজা ঠেলে, নবনী এসে দাঁড়ালো ছোট পাড়বাঁধানো কামিনীঝাড় লাগোয়া পুষ্করিণীর পাশে। ডুবসাঁতার আর পাশের বাড়ির বকুল গাছের ঝরে পরা ফুলের ভেসে থাকা দেখে বারবেলা শেষ হতো একসময় নবনীর। আর বর্ষাতে ঝুম বৃষ্টির উষ্ণ ফোঁটা মুখে মাখতো গলা অব্দি পুকুরজলে লুকিয়ে। আর রাতে জ্বরের ঘোরে মায়ের বুকে মিশতো। অযত্নে রাখা শ্যাওলা ধরা সিঁড়ি বেয়ে পুকুরের জলের কাছে এসে বসে নবনী। পুকুরজলে নিজের ছায়ায় খুঁজতে থাকে সেই কৈশোরকাল। আর পুকুরপাড়ে বাতাসে ভেসে আসা কামিনীর মিষ্টি সুবাস নবনীকে বার বার যেন বলতে থাকে, অনেক হয়েছে এবার ঘরে ফেরো।

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com