অন্তর্গত দাবানলের ভিতর বসবাসকারী তাবৎ কবিদের প্রতি রইলো বিশ্ব কবিতা দিবসের শুভেচ্ছা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল হোসেন

বিশ্ব কবিতা দিবস। আমাদের কবি ও কবিতা বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কবিতার জন্য একটা বিশেষ দিন পালনের এক রীতির শুরু। সেই আমলে কবিতা দিবসটা পালিত হতো অক্টোবর মাসের ৫ তারিখে। ক্রমে বিংশ শতাব্দীর পরের অংশে এসে এর জন্য নির্ধারিত দিনটার অর্থবহতা বিবেচনায় রোমান মহাকবি ভার্জিল-এর জন্মদিন ১৫ অক্টোবর পালন করবার চল শুরু হয়। যদিও তৎকালীন গ্রেট বৃটেনে এটা ৫ অক্টোবরই পালিত হতে থাকে। আবার কোথাও অক্টোবরের অন্য কোনো দিনে বা নভেম্বরের কোনো এক দিনেও পালিত হতো কবিতা দিবস। যদিও ল্যাটিন সাহিত্যের স্বর্ণযুগ বলে বিবেচিত অগাস্টাস যুগের মহাকবি ভার্জিল (১৫ অক্টোবর খ্রীস্টপূর্ব ৭০ সাল – ১৯ সেপ্টেম্বর খ্রীস্টপূর্ব ১৯ সাল)-এর জন্মদিন ১৫ অক্টোবরেই দিনটি পালিত হতে থাকে ইউরোপের অধিকাংশ এলাকায়।

১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর অধিবেশনে ‘বিশ্ব কবিতা দিবস’ (World Poetry Day) পালন করবার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। দিন ধার্য করা হয় ২১ মার্চ। কবিতার পাঠ, কাব্য রচনা, প্রকাশনা, এবং কবিতা বিষয়ক শিক্ষা – এসব প্রসঙ্গগুলোকে মননে ও প্রয়োগে উদ্বুদ্ধ করবার লক্ষ্যে এ’ দিনটা পালনের সিদ্ধান্ত জাতিসঙ্ঘ গ্রহণ করে। সেই সঙ্গে বিশ্ব কবিতা দিবস পালনের ঘোষণার পিঠে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে ইউনেস্কো বলে, ‘জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক সকল কবিতা আন্দোলনকে তরতাজা স্বীকৃতি দিতে এবং গতিশীল ও বেগবান করতে এমন একটা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত’।

গোটা বিশ্ব যে দিবস পালন করছে তা আমরা কতোটা জানি-মানি পালন করি! কবিতাকে কতোটা ব্যবচ্ছেদ করি, কবিকে করি কতোটা! কাব্যচর্চা বা কাব্য আন্দোলন আসলে কোথায় পড়ে আছে আমাদের নিজেদের দেশে সমাজে কী সাহিত্য চর্চার ডেঁরায়। কবি কোথায় আছে, কেমন আছে, তাঁরই আপন সীমানা বৃত্তে! আজকের এই দিনে কবিকে নিয়েই হোক তবে কয়েক ছত্র কথকতা। কবি আসলে কতোটা লিখে আর কতোটা যাপন করে কবিতাকে ! সাত রাজ্যের মানুষ যখন ঘুমের মার্গীয় সিদ্ধিতে ডুবে আছে, রাতের সেই শেষ ভাগে একটা কিশোর হয়তো নারকেল পাতার চিরল জ্যোৎস্নাদগ্ধ গন্ধে মাতাল হয়ে ডুবে রইলো রূপালী অন্ধকার ও সবুজের ভীড়ে। সেই ধ্যান ভেঙে তার দৃষ্টিসীমায় পাহাড়ের আড়াল থেকে যেই না উঁকি দিলো হলুদ কমলার গায়ে আগুন আঁচ লাগা সূর্য, তার ক্যানভাস জুড়ে অসম পাহাড়ী বক্রতার সীমান্ত জুড়ে দৃষ্টিসীমায় ভেসে উঠতে থাকলো আতসকাঁচের বিপরীতে থাকা অগণন ঘাসেদের উচ্চকিত তীক্ষ্ণ ডগারা। সামান্য কৈশোরেই তার মনে হলো এক্ষণে মারা গেলেও বুঝিবা জীবন সার্থক।

দেশ বিভাগের পর কলকাতা থেকে খুলনায় পাড়ি জমানো গোলাম সাবদার সিদ্দিকী পরিবারের সঙ্গে যেমন এসেছিলেন তেমনি পরিবারে সঙ্গে আর ফিরে যাননি। একা থেকে গেছেন এদেশে। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। কবিতা লিখেছেন ভিন্ন ঢঙে অভিনব ভাবনা বৈচিত্রে। জীবন যাপন করেছেন কবিতার অধিক অলৌকিক এক ধাঁচে। চারুকলা, বাঙলা একাডেমি কিংবা রমনা থানার বাঁক থেকে পরীবাগের বিপরীত মুখের গলিতে যতোবার দেখা গেছে তাঁকে একথান কাপড়ের এক-সেলাই আচকান পরে স্বগত শব্দ সংলাপ ছুঁড়ে দিতে দিতে হনহন করে হেটে যেতে – মনে হয়নি মানুষটা আদৌ কোন ইহলৌকিক জীবনের ভিতর বসবাস করছে। তখন আর সাফদার লিখছিলেন না কবিতা। যাপন করছিলেন কবিতার অধিক অপার এক জীবন।

আজিমপুরের একখানা বাড়ীর সিঁড়িঘরে পরিচ্ছন্ন বইয়ের দেয়াল ঘেরা যে নির্মলেন্দু গুণ বসবাস করতেন, তাঁর জীবনে বুঝি তখনো সেই হুলিয়া কবিতার চলচ্চিত্রায়ন চলছিল, মধ্য আশির দশকেও। যেমন মিঠেখালি মংলা থেকে জীবনের নির্যাস নিংড়ে এনে টিএসসি-শাহবাগ-সাকুমনি-রথখোলা জুড়ে আকাশের ঠিকানায় পোস্ট অফিসের শাখা খুলতে একটা জীবন খলবলানো প্রাণবান হাসির আড়ালে কবিতাকে সঁপে দিয়ে গেলো রুদ্র। কিংবা পৃথক পালঙ্ক জুড়ে জীবনের জলছবি আঁকা অবচেতনে রাজাধিরাজ। কবি সম্রাট আবুল হাসান মোহাবিষ্টতার ছত্র লিখে গেছেন একের পর এক ! লিখেই গেছেন কি ! যাপন করে গেছেন কবিতাকে। আর বলে গেছেন রাজা যায় রাজা আসের উপাখ্যান। জীবনকে এক এবং একটিমাত্র ইচ্ছেখামে পুরে কবিতার নিমগ্ন নীলে তাকে যাপন করে চলে গেছে সুহৃদ কবি শিমুল মোহাম্মদ। বিনতার চোখের জলসমুদ্র প্লাবনে ভেসে গেছে সে অলৌকিক ইচ্ছায় তারই শব্দেবোনা অনন্ত ভেলায়। সেই মরন ভাইরাস ছুঁয়ে গেছে সঞ্চয় প্রথম-কে তার পিতা ভিন্নধর্মী শক্তিমান লেখক সেলিম মোর্শেদ-এর হাতের ওপর দিয়ে। দিয়ে গেছে শোয়েব শাদাব-এর মতোন জীবনকে মামুলি ঘোষণায় আস্ত একখানা কাব্যময় জীবন যাপনের অনন্য বিলাসিতা দেখাবার স্পর্ধাকে। দাউদ হায়দার কিংবা সদ্য প্রয়াত শহীদ কাদরীর কথা না হয় না ই বললাম। কবিতার ভেতর বুঁদ হওয়া একটা জীবন যাপন করে যাওয়া কম বেশী ছুঁয়ে গেছে প্রতিটা কবিকেই। জ্ঞাতে অজ্ঞাতে, পরিস্ফুট কি অপরিস্ফুট যাপনে ও দৃশ্যকল্পে। শামসুর রাহমানের মতোন গোছানো নাগরিক কবির মুখেও তাই জীবন সায়াহ্নে শোনা যায় সেই বৈরাগ্যের স্বগোতোক্তি – কবিতাই যদি লিখবেন জানতেন জীবনভর, তবে তার সংসারী না হওয়াটাই ছিল উত্তম।

নির্মাণপিয়াসী ইচ্ছেরা শব্দ আর ভাবনায় এমনই বুঁদ করে রাখতে চায় কবিকে যে তার শরাব-জীবন-শায়েরী-যাপন সব কিছু একাকার হয়ে আছে সেই রুমী গালিব কিংবা তারও অধিক সময় গভীর অতীত থেকে। আজ অব্দি সেই বিধ্বংসী আবেগ কবিকে নিয়ত দুমড়ে-মুচড়ে দেয় জীবনের সমস্ত সুর-রাগ-তানে শব্দ সাজাবার টানে। ওই নেশায় সত্যি সত্যি বুঁদ হলে কবিতাকে নির্মাণ শুধুই নয়, যাপন করাই যে হয়ে ওঠে তার। সেই যাপন যতোটা সন্ন্যাস ও লাগামহীনতা ধারণ করবে ততোটাই অনন্য হয়ে উঠবে তার নির্মাণ। হয়তো কেউ কেউ লাগাম টেনেই করে উঠতে পারে সেই অলৌকিক পরিভ্রমণ ! পারে কি ! একটা পরিপূর্ণ দহন সেভাবে পুড়িয়ে না গেলে সৃষ্টির বেদনাবিহীন কোন প্রসব আদৌ কখনও ঘটে কি ! অন্তর্গত দাবানলের ভিতর বসবাসকারী পৃথিবীর তাবৎ কবিদের প্রতি রইলো বিশ্ব কবিতা দিবসের শুভেচ্ছা।

লেখকঃ কবি

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com