অনেক গান আর অনেক বই নিয়ে সাজানো ছিল রিনুদের ছোটবেলা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রিনি বিশ্বাস,সঞ্চালক ও বাচিক শিল্পী

চতুর্দিকে বাংলা ভুলে যাবার যে হই হই শুরু হয়েছে তা রিনুর মোটেই পছন্দ নয়! তাই ছেলেমেয়ে হবার সম্ভাবনাও যখন তৈরি হয়নি, তখন থেকেই রিনু মনে মনে তৈরি-ছেলে হোক বা মেয়ে তাকে নিজের ভাষাটা শেখাতেই হবে; বাংলায় গল্পের বই পড়ার যে মজা, সেটা যেন তার সন্তান পায়, এটা রিনুর বরাবরের ইচ্ছে; আরেকটা ইচ্ছেও রিনু সযত্নে লালন করতো; গান ভালোবাসানোর ইচ্ছে; সে নিজে যেমন গানে বুঁদ হয়ে থাকে, তেমনই তার ছানাও যেন গান ভালোবাসতে শেখে; যেন সবকিছুর পরে অন্তত নিজের জন্য খানিকটা সুর বাঁচিয়ে রাখতে পারে তার ভাবীকাল…বুলি ফুটতে যা দেরি, রিনুর ছানার মুখে অনর্গল খই ফুটতে লাগলো চব্বিশটি ঘন্টা! কাঁটায় কাঁটায় একবছর পুরো হবার দিন তিনি সদর্পে নিজের নাম বলতে পারলেন ‘পাব্বো’, পাবলো আর পাব্বো- ওই একই হল! তার আগে থেকেই অবশ্য ‘মাম্মাম্মাম’ বা ‘দাদ্দা’ বলা চলছিল! রিনুর মায়ের যারপরনাই আফশোস, তার আদরের ‘মহারাজ’, ‘দিয়া’ বলে ডাকলো অনেক পরে! তার আগে মা এবং দাদুকে ডাকা হয়ে গেছে! তো সেই পাব্বোবাবু শুনে শুনে দিব্যি ছড়া বলতে শিখলেন; পাব্বোবাবুর সামনে ছড়ার বই খুলে, ছড়া বলা হত; তিনি ছবি দেখতে দেখতে ছড়া শুনতেন; তোতাপাখির মতো ক’দিন পরেই সব বলতে শুরু করলেন পাব্বো! এমনভাবে বইয়ের পাতা খুলে, লাইনে আঙুল দিয়ে সে ছড়া বলে যায় যে দেখে তাক লেগে যায়; এক আধবার ভ্রম হয় ‘এতটুকু ছানা কি পড়তে পারে!!’ আসলে ছড়া আর ছবির একটা নিটোল ছাপ ততদিনে তার মাথায়; তাই সে দিব্যি দুলে দুলে সব ছড়া , পড়ার মত করেই বলে যেতে পারে;
টি ভি-তে পরপর দুটো অনুষ্ঠান- শ্রীমতী এবং পরে প্রথমা-তে রিনু কাজ করার সুযোগ পেয়েছিল; এই দুটো অনুষ্ঠানে ‘মিক্সড্ ব্যাগ’ সেগমেন্ট করার সুবাদে শহরের নামকরা বহু ডাক্তারের সঙ্গে তার তখন পরিচিতি। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ এক ডাক্তারবাবুর ইন্টারভিউ করতে গিয়ে রিনু প্রথম শোনে বাচ্চাকে টি ভি থেকে দূরে রাখার ভালো দিকের কথা; কার্টুন যে ছোটদের ‘হাইপার অ্যাক্টিভ’ করার ক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী, সেকথাও তিনিই প্রথম বললেন! রিনু নিজে বড় হয়েছে টি ভি-র বাইরের দুনিয়ায়; ‘টি ভি না দেখলেও মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না’ ছিল রিনুর বাবার বড় পছন্দের বাক্য!! একথা অবশ্য ঠিক যে রিনুদের ছোটবেলায় ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিল না; শহর কলকাতা তার কিছু বছর আগেই দূরদর্শনের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে; সাদা কালো, বাক্সবন্দী টেলিভিশন সেট তখন যাদের বাড়িতে থাকে, তাদের রীতিমত সমীহ করা হয়; এর কিছুদিন পরে আসবে রঙিন টি ভি – র যুগ; তবু তখন রিনুদের চেনাজানা প্রায় সবার বাড়িতেই টেলিভিশন এসে গেছে। কিন্তু বাবাই কোনদিন টেলিভিশনকে গুরুত্ব দিতে চাননি; তাই রিনুদের বাড়িতে ছিল প্রচুর রেকর্ড, ক্যাসেট, টার্ন টেবিল-রেকর্ড প্লেয়ার আর ডাবল ক্যাসেট প্লেয়ার; যেটাতে শহরের প্রথম এফ এম শোনার সুযোগ হতো রিনু-শুভ, দু ভাইবোনের; অনেক গান আর অনেক বই নিয়ে সাজানো ছিল রিনুদের ছোটবেলা; একবার একটা টি ভি কেনা হয়েছিল; তখন রিনুরা বেশ ছোট। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১২৫ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এক বিশেষ অনুষ্ঠান দেখানো হবে, শান্তিনিকেতন থেকে সরাসরি; ছোট্ট সাদা কালো টি ভি কিনেছিলেন বাবাই; সেদিনের অনুষ্ঠান আদৌ মনে করতে পারেনা রিনু; পরবর্তী সময়ে যে ক’বছর ওই টি ভি ছিল, তখনকার দেখা তেমন কোন অনুষ্ঠানও মনে আসেনা! টি ভি রিনুর কাছে চিরকালই অন্যগ্রহের; এই অবধি পড়ে যারা মুখ টিপে হাসছো, ভাবছো, যে কাজ করে টেলিভিশনে, সে বলছে এসব-মানেই ‘মিছিমিছি’-তাদের বলি, কষ্ট করে একবার রিনুর পুত্র বা পতিবাবুর সঙ্গে কথা কয়ে দেখো, এসব সাচা কি না!
যাই হোক, ডাক্তারবাবুর মুখে নিজের চেনা কথা শুনে রিনুর তো ভারি আনন্দ হল! ডাক্তারবাবু আরো বলেছিলেন ছোট থেকেই গান শোনানোর কথা; গান-বাজনা, চলতে থাকুক বাড়িতে, যতক্ষণ সম্ভব; সদ্যোজাত শিশুর জন্য নাকি তা খুব ভালো; জোর দিয়ে বলেছিলেন যে বাচ্চা গানের মধ্যে থাকবে সে খুব ছোট থেকেই তা ভালোবাসতে শিখবে; কে গাইছে তা চিনতে পারা মোটেই কঠিন হবেনা সেই শিশু যখন বড় হবে, তার কাছে! আবারো রিনুর পছন্দের কথা! কে না জানে, সারাটাদিন আর কিচ্ছুটি না দিয়ে, শুধু গান শোনার ব্যবস্থাটুকু করে দিলেও রিনু দিব্যি থাকতে পারে! অতএব হাতেকলমে এমনটা করা শুরু হল রিনুর পুত্রর কয়েকমাস বয়স থেকেই! এমনিতেও রিনুর মা বাবাই গান শুনতে ভালোবাসতেন, যখন শুনলেন নাতির জন্য তা ভালো হবে, তখন তো খাওয়া ঘুম ইত্যাদি বাদ দিয়ে বাকি সময় মৃদুস্বরে কখনও রবি ঠাকুরের গান, কখনও সরোদ বা সেতার, কখনও আবার অন্যকিছু বাজতে লাগলো বাড়িতে; তখন টানা বহু মাস পুত্রসহ রিনু থাকতো মা বাবার কাছেই; যেমন বলেছিলেন ডাক্তারবাবু, তেমনটিই হল; পাব্বোবাবু আজও গান এবং বাজনার ব্যাপারে দস্তুরমত দুর্বল! বাপি বাড়িতেও আপিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে অনেকসময়, তাই সব্বক্ষণ কানের কাছে গান তার তেমন পছন্দ নয়! এদিকে মাতা পুত্র পারলে চব্বিশটি ঘন্টা গান চালিয়ে রেখে দেয়! বাপি বাড়িতে না থাকার সময়ের সদ্ব্যবহার তারা করে; ছুটির দিনে বা দুপুরে খেতে বসে কিংবা রোজকার বিরক্তিকর কাজগুলো মানে ‘হোম ওয়ার্ক’ ইত্যাদি শেষ হলেই তারা গান শুনতে থাকে!
তো রিনুর কুট্টি ছেলের চোখ আর কান একই সঙ্গে সজাগ হল! সে শুনে শুনে বলতে লাগলো যাবতীয় কথা! বছর দেড়েক বয়সের নাতিকে কোলে নিয়ে বসে দাদাই, বাংলা অক্ষর চিনিয়ে দিলেন। সে খবরের কাগজ দেখে ‘রিনুর র’ বলতে শিখলো! পত্রিকার ‘প’ দেখিয়ে ‘পাব্বোর প’ ও চিনে গেল! আধো স্বরে সে এখানে ওখানে অক্ষর খুঁজে বেড়াতে লাগলো! নির্ভুল বুঝলেন, রিনুর ছেলে বিনা আয়াসে মাতৃভাষাই চিনতে শিখলো সর্বাগ্রে; বলি তো আমরা সবাই, কিন্তু চিনি ক’জন? বোধহয় তেমন করে চিনিনা বলেই সন্তানকেও চেনাতে পারিনা; না ভাষা, না আর কিছু; এরপর শিখলো ইংরেজি অক্ষর! তখন কিছুদিন চললো সেই অক্ষর খোঁজ করার খেলা! দু বছর বয়সে যখন সে ভর্তি হল তার প্রথম স্কুলে তখন সে মোটামুটি অ আ ক খ থেকে এ বি সি ডি, সবই চেনে! মুশকিল বাঁধলো এরও কিছু পরে; স্কুলে গিয়ে ম্যামদের ইংরেজি কথা শুনে শুনে শেখার ফাঁকে একসময় সে বাংরেজি বলতে লাগলো; হঠাৎ একদিন স্নান করানোর সময় মায়ের কথার প্রতিবাদে সে বলে উঠলো ‘না না, তুমি লাই টেলছো!’ সে বেচারা খানিক ইংরেজি, খানিক বাংলা মিলিয়ে ওই অবধিই বলতে পেরেছিল সেদিন! Telling a lie বলা সে শিখলো বেশ কিছুদিন পরে! তারপর টালীনালা দিয়ে বহু জল গড়িয়েছে; রিনুর পুত্র গড়গড়িয়ে বাংলা পড়তে লিখতে শিখেছে; গল্পের বইয়ের সঙ্গে তার বিশেষ সখ্য! বগলে বই নিয়ে ঘুরে বেড়াতে সে ভালোবাসে! অবশ্য বইয়ের ভাষা সবসময় বাংলা হবেই এমন কথা নেই, ইংরেজি বইয়ের প্রতিও তার সমান ঝোঁক; মোট কথা বই পড়া আর গানশোনার যে শখটুকু ছানাকে দিতে চেয়েছিল রিনু, সেটুকু সে পেরেছে!


ভবিষ্যতে পড়াশুনো-কাজকর্মের জীবনে ব্যস্ততার সঙ্গে তাল রাখতে গিয়ে আদৌ সে এমনই থাকবে কিনা তা পরের কথা; না পারলে যে তার কোথাও অস্বস্তি থাকবে, ‘কেন বই পড়ার সময় পাচ্ছিনা বা কতদিন ভালো গান শুনতে যাইনি, ধুস্’, এটুকু সম্পর্কে রিনু নিশ্চিত!

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com