অনন্য এক জননীর জন্ম দিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুদ্রাক্ষ রহমান

মাক্সিম গোরকির ‘মা’কে ভোলার উপায় নেই দুনিয়াদারির খবর যারা রাখেন তাদের। আর বাঙালি হয়ে জন্মেছেন, বাংলাদেশকে একটু হলেও ভালোবাসেন, তাদের পক্ষে ভোলা সম্ভব নয় রুমী’র মাকে। রুমীর মা, জাহানারা ইমাম, তিনি  জেনে-বুঝে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার তরুণ সন্তানকে পাঠিয়েছিলেন। গেরিলাযোদ্ধা রুমী দখলদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়ে মাকে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন, তবে ফিরে আসেনি তিনি।

সেই থেকে জাহানারা ইমাম শহীদজননী, শহীদ মাতা এবং রুমীর মা থেকে সারা দেশের, সকল মুক্তিযোদ্ধার মা।

আজ ৩ মে, তার জন্মদিনে প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে জানাই ভালোবাসা, শ্রদ্ধা।

‘১৯৪৫ সালে কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ থেকে তিনি বিএ পাস করেন। বিএড পাস করার পর ১৯৬৫ সালে তিনি প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ করেন। পরে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় স্কুলে শিক্ষকতার মাধ্যমে। ১৯৫২ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত তিনি ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। ফুলব্রাইট স্কলার জাহানারা ইমাম আমেরিকা থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে ১৯৬৬ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৬৮ সালের দিকে সে চাকরি ছেড়ে দেন। ব্যক্তিত্বময়ী জাহানারা ইমাম ষাটের দশকে ঢাকার সংস্কৃতি মহলে সুপরিচিত ছিলেন।’

এইটুকু তথ্য দিলো উইকিপিডিয়া।  জাহানারা ইমাম ছাত্র-পড়ানোর পাশাপাশি বিশ্ব সাহিত্যের কিছু অমর সৃষ্টি বাংলায় রূপ দিয়েছিলেন। কিশোর সাহিত্যে  সেই ক্লাসিকগুলোর জন্য জাহানারা ইমাম খ্যাতি পেয়েছিলেন খুব। আবারো তিনি আলোচনায় এলেন মুক্তিযুদ্ধে ছেলে হারিয়ে।  যুদ্ধের সময় তিনি তার স্বামীকেও হারান। তারপর বুকে পাথর চেপে একের পর এক  বই লেখেন তিনি। অন্যজীবন, বীরশ্রেষ্ঠ, বুকের ভিতরে আগুন, নাটকের অবসান, নয় এ মধুর খেলা, ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস, প্রবাসের দিনগুলি তার আলোচিত এবং পাঠকপ্রিয় বই। তবে সব ছাপিয়ে বিগত শতকের আটের দশকের শেষদিকে প্রকাশিত ‘একাত্তরের দিনগুলি’ নতুন করে তাকে চিনিয়ে দেয়। ছেলেকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়ে এক মা সেই যুদ্ধের ভেতরে বসে লিখে চলেছেন দিনলিপি। মুক্তিযুদ্ধকাল নিয়ে এমন লেখা সত্যি কষ্টসাধ্য। সেই কাজটি করেছেন জাহানারা ইমাম।

আর তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজটি করলেন ক্যান্সার আক্রান্ত শরীর নিয়ে, জীবনের শেষ বেলায় এসে। তিনি রাস্তায় নেমে ডাক দিলেন তার মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের। বললেন, যারা একাত্তর সালে নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে, আগুন দিয়েছে ঘর-বাড়িতে, যারা নারীর অবমাননা করেছে, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি, করেছে যুদ্ধাপরাধ তাদের শাস্তি হতে হবে।  মায়ের ডাকে সাড়া দিলেন বাংলার সন্তানরা। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ারদি উদ্যানে বসলো গণআদালত। সেই আদালত  জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমির গোলাম আযমের শাস্তি ঘোষণা করলো মৃত্যুদণ্ড।

সেই থেকে শুরু, বাংলাদেশে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের, যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জাহানারা ইমাম। তিনি নেই, ক্যান্সারের সঙ্গে লড়তে লড়তে বিদায় নিয়েছেন। তবে তার রেখে যাওয়া আন্দোলন থেমে নেই। যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার হয়েছে জেলের ভেতর মৃত্যু হয়েছে গোলাম আযমের। ফাঁসিতে ঝুলতে হয়েছে জামায়াত নেতা, একাত্তরের ঘাতক মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মো. মুজাহিদ, কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলী, বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে। বন্দি আছেন আরো অনেক যুদ্ধাপরাধী। আর এখনো বাংলাদেশ একটু বিপন্ন হলে জাহানারা ইমাম সামনে এসে দাঁড়ান; এই তো সেদিনও তিনি দাঁড়িয়েছিলেন শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চে, যেখানে তরুণদের চাওয়া ছিলো যুদ্ধাপরাধী-রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ। এখনো নতুন প্রজন্মের কাছে জাহানারা ইমাম এক সাহসের নাম।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com