অতল জলের আহবান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখবেন তার জীবনের কথা।কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো। পড়ুন কাটাঘুড়ি বিভাগে।

ছোটবেলার বন্ধুদের সঙ্গে কণকচাঁপা

কনকচাঁপা ছোটবেলায় পরীক্ষার ছুটিতে বছরে দুবার করে বাড়ি যেতাম,রোজ বছর। সেজন্য কি যে অপেক্ষা ছিল,এই অপেক্ষাতেই পরীক্ষা গুলো ভালো বা বেশী ভালো হতো।আর তারপর বাড়ি মানে দাদীবাড়ি গেলে হাতে পেতাম অনাবিল এক আনন্দঘন জীবন।প্রধান আকর্ষন ছিলো যমুনানদী!!! মন পড়ে থাকতো কখন গ্রামে যাবো।যাওয়ার পর আম্মা এতই ব্যস্ত থাকতেন নিজের দেবর ননদ ও সখী দের নিয়ে যে আমাদের খোঁজ নিতেই পারতেন না।সেই ফাঁকে যা খুশী আনন্দ করাতাম। সে আনন্দ ছিল বাঁধভাঙ্গা। দল বেঁধে চাচা ফুপু দের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম।কোনদিন হয়তো খেসারীর কলইয়ের ক্ষেতে হানা দিতাম,কোঁচড় ভরে কলই তুলতাম,মানে চুরি আর কি।একজন থাকতো পাহারায়।বাকিজন চুরি করতাম,চুরি করাতেই সব আনন্দ।অথচ নিজেদেরই কত কলুইএর ক্ষেত আছে!!! হাড়িপাতিল নুন নিয়ে ক্ষেতের পাশেই তা সিদ্ধ করে খেতাম।বুটের ডাল পেকে গেলে আস্ত গাছ সহ আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে আঞ্চলিক ভাষায় হোড়াপোড়া খেতাম।মুখ কালিকালি হয়ে যেতো। সেই খুঁটে খাওয়াতে ছিল স্বর্গসুখ। আর কারো দুধেল ছাগল কে একদম কোলে করে দূরে নির্জন এ নিয়ে গিয়ে বাঁটে মুখ লাগিয়ে দুধ খেতাম।হাহাহা।কিন্তু প্রধান আকর্ষণ ছিল যমুনানদী তা তো বলেছিই।আম্মা একদমই যেতে দিতেন না কারণ আমি ছিলাম দুষ্টুর দলের সবচেয়ে পুচকা সদস্য।তো একদিক আম্মার নিষেধ সত্বেও ওদের পিছু নিলাম।ওরা অনেকটা চলে গিয়েছে।আমি দূর থেকে লুকিয়ে রওনা দিলাম।আম্মাও জানেন না, ওরাও না।একসময় নদীর উঁচু পাড়ে ওরা থামলো।আমি একটা ক্ষেতের আড়ালে লুকালাম।ওরা এবার পাড় থেকে নীচে নামলো।এবং নদীর তীর ধরে হাঁটা শুরু করলো।আমি ওই উঁচু পাড় থেকে আর নামতে পারছিনা।কিন্তু বাড়িও ফিরে যেতে পারবোনা কারণ ফেরার পথ চিনিনা।পাড় থেকে নামতে গিয়ে হাঁচড়েপাঁচড়ে গড়িয়ে যেতে থাকলাম।হাটু কনুই ছিলে গেলো। কিন্তু আমার তো থামা চলবেনা! ওরা তীরের দিকে ক্রমশঃই কালো বিন্দুতে পরিণত হচ্ছিল! আমি ওদের থেকে চোখ সরাইনা।নদীর এক চর থেকে ওরা একটা শাখানদী পার হয়েছে।ছিপছিপ পানি,কিন্তু লম্বা দুরত্ব।

ওরা নদীর ভেতরে আরেকটা চরে যাবে বোধহয়। আমি তো আর এতো জানিনা।ওরাও জানেনা আমি পিছু নিয়েছি।এবার ওই ছিপছিপে পানি পার হওয়ার পালা।শুরু করলাম হাঁটা।পাতা পানি একটু একটু করে হাঁটু পানি হয়ে গেলো। চলছি তো চলছিই।হাঁটু পানি কোমড় পানি হলো।আমি ওদের দেখছি! হঠাৎ আর পানির তল খুঁজে পাচ্ছিলাম না।আমি দেখলাম নীল সবুজ পৃথিবী। আমি অনেক রঙ আবিষ্কার করলাম।মাছ এভাবে ঘুরে বেড়ায়? নীল রঙ এতো সুন্দর! সঙ্গের সবুজ কি স্কুলের খাতায় ছিল? হঠাৎ মা কে মনে হলো।মায়ের দীঘল কালো চুলে কি এমন সাঁতার হয়? আমার পরীর দীঘল কালো নদী কি মাঝরাতে চুল হয়ে যায়? আমি ডুবছি ভাসছি ভাসছি ডুবছি কালো নীল সবুজ কত রং খেলছে আমার ভাবনা জুড়ে! হঠাৎ হলদে আভায় ভেসে উঠলাম।তারপর আর কিছু মনে নেই।কিন্তু মনে আছে জ্ঞান ফেরার পরে দেখলাম আম্মা আমার ছাবিয়া ফুপুকে খুব মারছেন,ফুপু কাঁদছেন না! তারা আমাকে কিভাবে পেলেন, কিভাবে বাড়ি ফিরলাম আজো জানা হয়নি।মা হয়তো মনে রেখেছেন,হয়তো রাখেননি। আমিও আর এই উপাখ্যান ঘাঁটিনি।থাক না কিছু পরাবাস্তব বা অতিবাস্তব জীবনের বাড়তি কিছু সবুজ নীল কালো হলুদাভ মলমলের পর্দা একান্ত আমার হয়ে।মাঝেমধ্যেই সেই অতলল জল আমাকে আহবান করে— কনা! আয় আয় আয়, তোকে অনেক রঙ দেবো, আয়,ছবি আঁকবি,সেই কবে থেকে আমরা জলেরা,মেঘেরা,বৃষ্টিরা, বন্যারা তোর অপেক্ষায়,তোকে রঙ দেবার আকাঙ্ক্ষায় বসে আছি! আয় আয় আয় কনা। কনা ঘুমের মধ্যে খাবি খায়,ঘেমে নেয়ে জেগে উঠতে গিয়ে দেখে একচিলতে হলুদাভ সবুজ জীবন,যাকে সে যমুনায় তলিয়ে গিয়ে বেঁচে উঠতে শেষ দমে দেখেছিল! তবে কি জীবন ফিরে পাওয়ার শুরুতে এই হলুদাভ সবুজ অধ্যায় থাকে? আর মৃত্যুর শুরুতে থাকে লোভনীয় নীল? আর তা কালোয় গিয়ে থামে? মায়ের চুলের সাঁতার কি সেই অনন্তকাল এর মসৃণতা? হে আল্লাহ! আমি মৃত্যু কে চিনতে চাই,অনুভব দিয়ে,বিবেচনা দিয়ে,রঙ দিয়ে,মৃত্যু কে আকাঙ্ক্ষা করার স্পর্ধা তুমি আমায় দাও।আমি হেসেখেলে ছবি এঁকে এই পৃথিবী থেকে চলে যেতে চাই।হে অতল জলের আহবান, আমায় গ্রহণ করো,তোমার করো,তোমার করে।

ছবি: সৌজন্যে লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com