অতঃপর তিনি বললেন, ‘স্মৃতিটুকু থাক’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুদ্রাক্ষ রহমান

স্মৃতি কত রঙের হয়। সে জগতে বাস করে লাল, নীল, হলুদ রঙা মানুষ আর তাদের নানা গল্প-কথা। স্মৃতিচারণমূলক বই তাই সবসময়ই অন্য এক ব্যাঞ্জনা তৈরী করে পাঠকদের জন্য। লেখক যেমন বইটি লিখে ফিরে যান ফেলে আসা জীবনের কাছে তেমনি পাঠকও তার হাত ধরে পাতা উল্টে যান সময়ের।

আমাদের চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম প্রধান অভিনেত্রী কবরী লিখেছেন তার নিজের আতজীবনী ‘স্মৃতিটুকু থাক’। বইটি আমাদের দেশের পাঠকদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। এরকম বই অভিনয় শিল্পীদেও কলম থেকে আগে এসেছে বলে জানা নেই। এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন এই অভিনেত্রীর ‘স্মৃতিটুকু থাক’ নিয়েই।

তাকে নিজের লেখা স্মৃতির রেখা নিয়ে কেন আলাদা করে বলতে হবে? প্রয়োজন নেই। তিনি যা বলার বলে দিয়েছেন বইয়ে। আরো অনেক অনেক গল্প, কথা বাকি আছে। হয়তো তিনি বলবেন কোথাও, কোনো একদিন। হ্যাঁ, বাংলাদেশের বিশিষ্ট অভিনয় শিল্পী কবরীর লেখা আত্মস্মৃতি ‘স্মৃতিটুকু থাক’ প্রসঙ্গেই বলছি। কবরীর সঙ্গে প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে কথা বলার চেষ্টা করা হয়েছিল। তিনি আগ্রহ বোধ করেন নি। না-ই করতে পারেন। একটু আগেই তো বললাম নিজের স্মৃতিকাহিনি নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার হয়তো প্রয়োজন নেই। যা বলার তাতো বইতে বলা হয়ে গেছে।

এটা আমি বাজি ধরে বলতে পারি, আমাদের চলচ্চিত্রে এখনও সবচেয়ে আলোচিত নাম, কবরী-রাজ্জাক কিংবা রাজ্জাক-কবরী। এটা এক আলোচিত জুটিও। এক দিন, দু’দিন নয় প্রায় চল্লিশ বছর ধরে এই আলোচনা চলছে; কখনো তা তীব্রভাবে, কখনো বা মৃদুলয়ে।

আমাদের চলচ্চিত্রে কবরী আলাদা করেই একটি বিশিষ্ট নাম, একটি কিংবদন্তী। তাই তিনি যখন তার কিছু অজানা কথা নিয়ে, গল্প নিয়ে কোনো বই লেখবেন তখন তা নতুন করে আলোচনায় আসবে, এটা বিলক্ষণ। ১৯৬৪ সালে  স্কুলবেলা শেষ না করা একটি মিষ্টি মেয়ে ‘সুতরাং’ সিনেমা দিয়ে আবির্ভাব ঘটিয়ে দিলেন, তারপর কত কাল!  রাজ্জাকের সঙ্গে ঈর্ষনীয় জুটি। একের পর এক আলোচিত হিট ‘বই’ উপহার দিলেন কবরী।  তিনি যদি কেবল রাজ্জাকের সঙ্গে তার অধ্যায়টুকু নিয়ে কোনো বই লিখতেন, তাও আলোচিত হতে বাধ্য; যেমন ওপার বাংলায় উত্তম-সুচিত্রার বিষয়টি পরিশীলিত বাঙালি হৃদয়ে কালকাল ধরে কেমন জায়গা করে নিয়েছে অনড় হয়ে। আমাদের রাজ্জাক-কবরীও অনেকটা তেমন জুটি। কবরী তার একমাত্র বই, ‘স্মৃতিটুকু থাক’-এ রাজ্জাক সম্পর্কে লিখেছেন, ‘এক সঙ্গে কাজ করেছি অনেক ছবিতে- বন্ধুত্ব হবারই কথা, হয়েছে। কিন্তু রাজ্জাক সাহেব বরাবরই আমাকে হিংসে করেন। আমি করতাম কিনা জানি না। আমি তাকে বন্ধুর পরও আরও একধাপ এগিয়েই রেখেছিলাম।’

ইয়েস, এই হলেন আমাদের কবরী- এ বাংলার মহানায়িকা, মিষ্টি মেয়ে। তিনি জীবন দেখেছেন, রূপালী পর্দায় দাপটে রাজত্ব করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন, রাজনীতি দেখেছেন , এখন শিক্ষকজীবন দেখছেন, যা ছিলো আজম্ম লালিত এক স্বপ্ন তার। সেই তিনি আমাদের চলচ্চিত্রের ‘নায়করাজ’- রাজ্জাক সম্পর্কে এমন কথা বলে দিতে পারেন অকপটে। তিনি আরো অনেক কথাই বলে দিয়েছেন ‘স্মৃতিটুকু থাক’-এ। বলেছেন নিজের প্রেম নিয়ে, ‘আমার কপালে প্রেমের সুখ কোনোদিন হয়নি। যাক আপদ চুকেছে। প্রেমে পড়ে কার না কার ঘরনী হতাম। তবে যা হবার তা তো হয়েছেই । সবার জীবন কি এক রকম হয়? এই পৃথিবী একটা যুদ্ধক্ষেত্র। যুদ্ধে কেউ জেতে কেউ হারে, মেনে নিতেই হয়। এভাবেই বুঝি জীবন কেটে যায়।’

র্দীর্ঘ সময় পরেয়িে এসে আজ কবরী নজিকেইে প্রশ্ন করনে, ক্যামরোর সামনে নায়ক-নায়কিার সইে ভালোবাসা কি শুধুই অভিনয় ছিলো?

“ভালো লাগতে লাগতইে তো ভালোবাসা হয়, অভিনয় করতে করতে যদি ভালোবাসা না-ই হয় তাহলে মানুষরে মনে ভালোবাসা তৈরী হবে কী করে ? সিনেমামোদী যারা এইসব সিনেমা দেখেছেন তারাও হয়ে যেতেন রাজ্জাক আর অপরপক্ষ নিজেকে ভাবতো কবরী, তাই না?”

১৯৭৩ সালে ‘রংবাজ’ সনিমোয় র্দশক এক লাস্যময়ী কবরীকে আবষ্কিার কর। সেই চলচ্চত্রিরে ‘সে যে কেন এলো না, কিছু ভালো লাগে না’ গানটি আজও অনেক র্দশকরে স্মৃততিে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছে।

বিগত শতাব্দীর, ছয়ের দশক। চট্টগ্রামের ছোট্ট একটা মেয়ে মিনা পাল, আমাদের সিনেমার আরেক কিংবদন্তী সুভাষ দত্তের হাত ধরে হয়ে উঠলেন কবরী। তারপর তিনি তার মিষ্টি অভিনয় দিয়ে দর্শক হৃদয়  জয় করে নিলেন। ‘সুতরাং’ বাদ দিয়েই যদি বলি, নীল আকাশের নীচে, রংবাজ, বেঈমান, অবাক পৃথিবী, সুজন সখী, সখি তুমি কার, সারেং বউ, বধু বিদায়, দিন যায় কথা থাকে, আরো আরো কত সিনেমা তিনি করেছেন। ২০০৬ সালে ‘আয়না’ নামে একটি সিনেমায় পরিচালকও হয়েছিলেন কবরী। এর বাইরে রাজনীতি! সেই আগুনেও হাত পুড়িয়েছেন তিনি। নির্বাচিত হয়েছেন জাতীয় সংসদ সদস্য। আর এখন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি শিক্ষক।

সব মিলিয়ে এক ঝড়ো জীবন। সেই জীবনের কিছু কথা নিয়েই ‘স্মৃতিটুকু থাক’। ২০১৭ সালের অমর একুশে গ্রন্থ মেলায় বইটি প্রকাশ করলো- বিডিনিউজ পাবলিশিং লিমিটেড-বিপিএল। বইটি মেলায় এলো একবাবে শেষ বেলাতে। সেই বই হাতে পেয়ে অনেক বিশিষ্টজন অনেক কথা বললেন। তবে কবরী তার বই নিয়ে আলাদা করে কিছু বলতে চাননি আমাকে। তার ফোন নম্বরে ডাক পাঠালে রেজোয়ান নামে একজন বললেন, ‘কবরী ম্যাডাম বই নিয়ে কিছু বলবেন না।’

 তবে তার প্রথম বইটি এই মেলার বেস্ট সেলার হতে পারতো। একটু আগে যদি বইটা আনা যেতো মেলায় তাহলে অনেক কিছুই ঘটতে পারতো। বিষয়টা যখন কবরী তখন এখনো অনেক কিছু ঘটার বাকি। বইয়ের মোড়ক খোলা অনুষ্ঠানে এককালের  তুখোড় ছাত্রনেতা-হালে মন্ত্রী, রাশেদ খান মেনন তো বলেই দিলেন, তাদের তারুণ্যে কবরী ছিলেন হার্টথ্রব। কবরীর বইয়ের খোঁজ নিতে মেলায় আসার লোভ সামলাতে পারেননি ঠাণ্ডা মাথার বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদও। আর বই প্রকাশিত হওয়ার আগে কবি নির্মলেন্দু গুণ পান্ডুলিপি পাঠ করে বলে দিয়েছেন, তার মনে হয়েছে তিনি কোনো কবির লেখা গদ্যে আত্মজীবনী পড়ছেন। এই বই নিয়ে সাধারণের আরো কত কথা!

লেখক: গল্পকার

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com