অণু গল্পঃ জল জ্যোৎস্না

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

স্মৃতি ভদ্র (নিউ ইয়র্ক থেকে)

আকাশ আন্ধার থাকতেই শুরু হয় জ্যোৎস্না বেগমের দিন। সক্কল দিন হাঁসগুলানরে বিলের পানিতে ভাসাইয়া জ্যোৎস্না বেগম চোখ দিয়া বিলের পানি মাপে। শ্রাবণ মাসের থই থই করা বিল আর ফাল্গুন- চৈত্রের খাঁ খাঁ করা বিলের ছবিখান ধরা থাকে তার চোক্ষের ভিতর। আইজকা শ্রাবণ মাসের শেষ শুক্কুরবার। জুম’আ শেষে চেয়ারম্যান সাব মাসের পাওনা মিটাইয়া দিব। হাতে কিছু পয়সা আসলেই জ্যোৎস্নার বাপের জন্যে মন পোড়ায়। ল্যাংড়া বাপটার জন্য কত কিছু করতে যে মন চায় তার! কিন্তু মতিন মিয়ার লাইগ্যা কিচ্ছু করতে পারে না জ্যোৎস্না। জ্যোৎস্নার হাতে ট্যাকা আওনের লগে লগেই চিলের লাহান ছোঁ মাইরা সব ট্যাকা লইয়া যায় মতিন মিয়া। আইজক্যা কিছু একটা পথ বাতলাইতে হইব, কিছু ট্যাকা রাইখা আসতে হইবো আজ। বাপটার শরীরডা শেষের পূর্ণিমা থ্যাইকা খুব খারাপ। রাইতে রাইতে জ্বর আর গিটে গিটে বিষ ব্যাথায় কাতরাইতাছে আজ এতগুলান দিন। আজ ট্যাকা পাইলে কাল গন্জে গিয়া ওষুধ আনবো বাপের জন্য জ্যোৎস্না। বিলের রূপার লাহান রূপালী পানিতে আইজ আসমানের কালা ম্যাঘের ছায়া। আসমানের কালা রংখান বিলটারে য্যান ঢাইকা ফেলাইছে। কখন জানি আসমান ভাইঙ্গা বৃষ্টি নামবো। জ্যোস্না তাড়াতাড়ি বাড়ির মইধ্যে ঢুইকা পড়ে। ঘরের কাজ জলদি সাইরা কাজে যাইতে হইবো। ঘর দুয়ার ঝাড় দিয়া জ্যোৎস্না পাকের ঘরে যায়। মাটির সানকো দিয়া ঢাকা ভাতের হাড়িতে কাল রাতের ভাতে পানি দেওয়া। পানি থ্যাইকা ভাত উঠাইয়া আরেকটা সানকিতে রাখে। একটা পেঁয়াজ খোসা ছাড়াইয়া আর দুইখান শুকনা মরিচ আগুনে পুড়াইয়া সানকিতে রাইখ্যা দেয়। এইটা মতিন মিয়ার সকালের খাওন। এর লগে মতিন মিয়া একটু তেল মিশাইয়া খাইয়া লয়। পাকের ঘর থ্যাইকা যখন বাইর হয় জ্যোস্না, তখন বাতাস ছাড়ছে হুড়মুড়াইয়া। আর তার লগে বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা। জ্যোৎস্না এক দৌড়ে গিয়া শোওনের ঘরে ঢোকে। বাপের দেওয়া চৌকিখানে,গতবারের বর্ষায় মার মরণের আগে দেওয়া রঙিন কাপড়ের কাঁথা টা বুকে জড়াইয়া হা কইরা মতিন মিয়া ঘুমাইতাছে। হা করা মুখখান দেইখা জ্যোৎস্নার বিতৃষ্ণা আরোও বাড়ে। তিন বছরেও লোকটারে আপন ভাবতে পারলো না ও। চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে আনা হরলিক্সের বয়ামে রাখা কদমাগুলান থ্যাইকা একটা কদমা নিয়া মুখে দেয় জ্যোৎস্না। কড়মড়াইয়া কদমাটারে দাঁতে দাঁতে ভাঙে। ঢকঢক কইরা এক গ্লাস পানি খাইয়া কাজে বাইর হয় জ্যোৎস্না। চারপাশে বিল লইয়া জ্যোৎস্নার পানির জীবন! ঘরের পিছনের মাটিতে পোঁতা খুঁটির সাথে ডিঙ্গি নৌকাখান বাঁধা। জ্যোৎস্না বাঁধন খুইলা পানিতে ভাসান ডিঙ্গিটায় গিয়া বসে। বৈঠা দিয়া পানি কাইটা আগায় চেয়ারম্যানের বাড়ির দিকে। বাতাসের তোড় বাড়তাছে। বিলের পানিতে য্যান সমুদ্দুরের ঢেউ! ঢেউয়ের লগে যুদ্ধ আর বৃষ্টির লগে সন্ধি কইরা ভিজা ভিজা চেয়ারম্যানের বাড়িত আসে জ্যোৎস্না। বড় গেট দিয়া ভেজা কাপড় শরীরে লেপ্টা যখন জ্যোৎস্না ঢুকতাছে , তখন বৈঠকখানা থেইকা একজোড়া চোখ আড়ালে ওর শরীরে বিলি কাঁটতাছে! জুম’আ শেষে চেয়ারম্যান বসছে সবার মাসের হিসাব মেটাইতে। একে একে সবার পাওনা মিটাইয়া শেষে আসে জ্যোৎস্নার কাছে।দুইশ টাকা বেশী দিয়া জ্যোৎস্নার হাতে গুঁজতে থাকে চেয়ারম্যান। ‘ কাল থেইকা কাজের শেষে গুদামে আইবি আমার জন্য বিকালের নাস্তা লইয়া তুই। তরে এই কাজের জন্য আমি পোষাইয়া দিমু।’ বইলা লোভাতুর চক্ষে জ্যোৎস্নারে গিলতে থাকে চেয়ারম্যান। এক দৌড়ে চেয়ারম্যানের কাছ থেইকা পালাইয়া আসে জ্যোৎস্না। কাঁপুনীধরা শরীরটারে খুব কষ্টে স্হির করে ও। আর আইবো না এই বাড়িত কাজে পণ করে। বৃষ্টি আর বাতাসের তুফান শেষে বিল এখন শান্ত। ডিঙ্গি লইয়া বিল পাড়ি দিয়া বাড়িত আসে। মতিন মিয়া আজ বাড়িতেই আছে। মাসের শেষ জুম’আ মতিন মিয়ার কাছে ঈদ দিনের লাহান। বউয়ের টাকা পাওনের দিন। গন্জে গিয়া বাজি ধইরা তাস খেলনের দিন। আর সব থেইকা খুশীর কথা হইলো মাল খাওনের দিন। জ্যোৎস্না আইতেই ” ট্যাকাগুলান দে ” বইলা হাত বাড়ায় মতিন মিয়া। ” এবার সব ট্যাকা দিমু না। আর ঐ বাড়িত কামও আর করমু না” জ্যোৎস্না বলে অল্প কিছু ট্যাকা দেয় মতিনরে। কম টাকা হাতে পাইয়া মাথায় আগুন জ্বইলা যায় মতিনের। ” আমারে সব ট্যাকা দে কইলাম। আর কাজে যাইবি না ক্যান? কাজ ছাইড়া খাবি কি?” চোক্ষের ভিতর আগুন মতিন মিয়ার। ” চেয়ারম্যান আমারে কু প্রস্তাব দেয়। মইরা গেলেও আমি কাজে যামু না।” জ্যোৎস্না কঠিন স্বরে কয়। কথা শুইনা ছুইটা আইসা বউয়ের চুলের মুঠি ধরে মতিন। কইষা দুইটা ধাপ্পড় মারে। “তোরে কাজে যাইতে হইবো। নাইলে আমি তোরে মাইরা ফালামু।” বাকী ট্যাকা কাইরা নিয়া গজরাইতে গজরাইতে বাইর হইয়া যায় মতিন মিয়া। আজ ভরা পূর্ণিমার চাঁদ আসমানে। চাঁদের আলোয় বিল ভাইসা যায়তাছে। মতিন মিয়া গৌর মাঝির নৌকা থেইকা টলকাইয়া নামে। গৌর মাঝির রেডিও তে গান বাজতাছে,”আমি রূপনগরের রাজকন্যা।” নৌকা আস্তে আস্তে দূরে যাইতে থাকে। কিছু একটার বাড়ি খাইয়া মতিন মিয়া বিলের পানিতে পইড়া যায়। বিলের জ্যোৎস্না মাখান রূপালী পানি আস্তে আস্তে লাল হয়। মতিন মিয়া পানির তলে হারাইয়া যায়। জ্যোৎস্না এখন বাপের লগে থাকে। সেই পূর্ণিমা থেইকা মতিন মিয়া নিখোঁজ!!

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com