অণু গল্পঃ গরম ভাত ও ইলিশ মাছের ঘ্রাণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুদ্রাক্ষ রহমান

অনেক কাল পরে এমন বর্ষা এসেছে বিক্রমপুরে। যেদিকে চোখ যায় জল থই থই। খালে পানি, বিলে পানি, চকে পানি, ক্ষেতে পানি। মাঠ ছাড়িয়ে পানি ঢুকে গেছে বাড়ির উঠানেও। ক’দিনের অবিরাম বৃষ্টিতে পানি কেবল ‘বলছে’-ই। বিক্রমপুরের গতর ছুঁইয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা নদীর পানিও বলছে কিশোরীর বাড়ন্ত শরীরের মতো।
ছন্দু শেখ সেই সকাল থেকে মাটির টানা বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখছিলো। মাথার ওপর টিনের চৌচালা ছাউনি। দক্ষিণদুয়ারি এই ঘরের পরে দক্ষিণে বড় উঠান। পশ্চিম দিকে একটা কাচমিঠা আম গাছ। সেই গাছের একটু দূরে ছনের ছাউনি দেয়া রান্নাঘর। সেই ছাউনিতে বৃষ্টি পড়ে। বৃষ্টির পানি ছনের ডগায় এসে যখন জমা হয় তখন ঠিক মুক্তো দানার মতো মনে হয়। আর একটু আলো পেলে ঝিলিক দিয়ে উঠে সেই বৃষ্টিফোটা। তারপর পানির ভার যখন একটু বেশি হয় শব্দহীন ঝরে পড়ে মাটিতে; মিশে যায় উঠানের ঘোলা পানির সঙ্গে। ছন্দু শেখ উদাস হয়ে সকাল থেকে বৃষ্টি আর পানির এই খেলাটা দেখছিলো; আর কখন যে তার পেছনে এসে দাঁড়িয়ে শুকতারা, ছন্দু শেখের স্ত্রী তা টেরই পায়নি সে।
:কী গো, থম ধইরা বইয়া আছো কেন?
শুকতারার কথায় ঘোর ভাঙে ছন্দু শেখের। সম্বিত পেয়ে স্ত্রীর দিকে ছড়ানো একটা চাহনী দিয়ে বলে,
-মেঘ নামলে দুনিয়াডা কেমন ঠান্ডা অইয়া যায় রে; আর আমার খালি ছোডবেলার কতা মনে পড়ে! এমন মেঘনামা দিনে বাবার লগে পদ্মায় যাইতাম। সারা রাইত ইলশা মাছ ধরতাম। খিদা নাই, ঘুম নাই। ধল প্রহরের সোময় বাবা আমারে বড় বড় কয়ডা মাছ দিয়া গোলবর খার নাউয়ে উডাইয়া দিতো। নদী পিছনে থুইয়া ধাপাইড়া খাল, কী যে কাটাল আছিলো সেই খালে!  সেই খাল দিয়া নাউ আসতো আমাগো ঘাটে। বিয়ানবেলায় মায় হেই মাছ কুইট্টা, সইষ্যার তেলে ভাইজ্জা গরম ভাতের লগে আমাগো দিতো। লগে থাকতো কাগজি লেবু।
: হেই দিন কি আর আছে! বলেই শ^াসটা লম্বা করে ছড়িয়ে দেয় শুকতারা।
-থালভরা ফুলের মতো সাদাভাত আর ইশলা মাছের ঘেরান; খিদায় জ¦ালায় পাগল আমাগো আরো পাগল কইরা দিতো। জানস শুকতারা, আমি চোখ বুজলে সেই ঘেরানডা এখনো পাই!
স্বামীর কথায় গভীর বেদনা এসে ভর করে শুকতারা বুকের ভেতর। ভীষণ কাঁদতে ইচ্ছে করে তার; কেনো না সে জানে এজীবনে আর ইলিশ মাছ মুখে তুলতে পারবে না ছন্দু শেখ। কঠিন কী এক অসুখ হওয়ার পর এই মাছ খাওয়া চিরতরে বারণ করেছে ডাক্তার।

 লেখক: গল্পকার

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com