অডিও পাড়ায় আমি,যেন বিচ্ছিন্ন একজন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

জীবনে প্রথম শিরোনামহীন ক্যাসেট বের হয়েছিলো কনকর্ড অডিও কোম্পানি থেকে। বলাই বাহুল্য মারমার কাটকাট ব্যাবসা সে অ্যালবাম করেনি।তখন আসলে গানের একটা ক্রান্তিকাল যাচ্ছিলো। মানুষ কেমন গান শুনবে এটা কেউই বুঝতে পারছিলোনা হয়তো, আর আমার গানগুলো ছিলো নিতান্তই সুরেলা , কাউকে যে কাটেনা ধরনের শান্ত গান।কারো হয়তো চোখেই পড়েনি।একই সঙ্গে বেবি নাজনীন আপার ক্যাসেট বের হলো।সে ক্যাসেটের ছবি দেখে আমার ভিরমি খাওয়ার দশা। কি তার বেশভূষা কি তার জেশ্চার পশ্চার! আমি তো ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতেই পারিনা, তাও যদি পারি তো ক্যামেরার লেন্স বরাবর ক্যামেরাম্যানের নির্দেশনায় তাকানো আর প্লেন চালানো একই রকম অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।এর পর এস এস প্রোডাকশন থেকে একটা সেমি ক্লাসিক্যাল গজল টাইপের ডুয়েট ক্যাসেট বেরুলো। সহশিল্পী সজল মাহমুদ। ওই ক্যাসেটের ” এ তুমি যে সেই তুমি নও” “জানি আসবে তুমি পায়ের শব্দ শুনি” এই গানদুটো জনপ্রিয় হলো কিন্তু তা আমি তখন জানিনি।তারপর মধুমিতা মিউজিক কোম্পানি থেকে বের হলো নীলাঞ্জনা নামের ক্যাসেট। এই ক্যাসেটের “নীলাঞ্জনা নামে ডেকোনা নীল চোখ নোনা জলে ভরেছে” গানটিও জনপ্রিয় হলো। তবে সেই জনপ্রিয়তা হলো নিঃশব্দ জনপ্রিয়তা।সে খবর আমার কানে তখন পৌঁছাতে অনেক দিন সময় লেগেছে। এরপর আমি ডন কোম্পানিতে টানা ছয় বছর কাজ করেছি নিষ্ঠাবান শ্রমিকের মতো। আমার প্রিয় গান ১ আর আমার প্রিয় গান ২ সুপার ডুপার হিট হওয়ার পরে ডন কোম্পানি পারিশ্রমিক বাড়িয়ে আমাকে প্রায় পঁচিশটি ক্যাসেটের জন্য চুক্তিবদ্ধ করলেন। হারানো দিনের গান, পুরনো দেশের গান,নজরুল সঙ্গীত, আমাদের দেশের চিরন্তন পল্লী গীতি এবং লতা মুঙ্গেশকরের পুরনো হিন্দি গানের ক্যাসেট সেগুলো। নতুন কিছু গান ও করেছিলাম।মইনুল ইসলাম খান, বদরুল আলম বকুল, আলী আকবর রুপু, এবং মান্নান মোহাম্মদ এর গান ছিলো সেখানে। তা থেকে মান্নান মোহাম্মদের “বিরহে পোড়াইলা তুমি আমার এ অন্তর ” কাঁচের মতো ভাঙলি রে তুই আমার এ অন্তর ” গান দুটি খুবই জনপ্রিয় হয়, তবে তাও আমি তখন জানতে পারিনি। না জেনে ভালোই হয়েছে। আমি ভালো গান ভালো করে গাইবার জন্য নিজেকে ঢেলে দিয়েছি ক্রমাগত। না হলে হয়তো নিজেকে স্টার ভাবলে ভাবতেও পারতাম! বলা যায়না হাজার হলেও আমি মানুষ তো!

এরপর ছবির গানে দিনরাত সমান হয়ে গেলো যখন তখন ক্যাসেটের গানের জন্য সময় দেয়াই মুশকিল ছিলো। ক্যাসেটের গানের জন্য সব শিল্পী রীতিমতো হোমওয়ার্ক করতেন। তাদের একটা দুইটা আড্ডার জায়গা থাকতো। সেখানে কোন গান মানুষ শুনবে, কেমন করে ছবি তুলে প্রচ্ছদ এ দিলে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়বে এগুলো ভালোমন্দ গবেষণা হতো। সেসব হোমওয়ার্ক খুবই প্রয়োজনীয় ছিলো কিন্তু আমার পক্ষে সেসব আড্ডায় সময় দেয়ার মতো সময় ছিলো না।তাই ক্যাসেটের জগত থেকে আমি বিচ্ছিন্নই ছিলাম বলা যায়।ডন কোম্পানি গান যা দিতো গেয়ে দিতাম কিন্তু ছবি তোলার জন্য বললে আমি নিজেও মুশকিলে পড়তাম ডন কোম্পানিকেও মুশকিলে ফেলতাম। কারণ ছবি তোলার জন্য যে সাজ সেটা ডনের পছন্দ হতো না।কিন্তু একরোখা আমি এসব ব্যাপারে সবসময় অবিচল। আমার কাপড়, ছবির ভঙ্গি, মেকআপ সব আমার নিজস্বতা! প্রফেশনাল মেকআপ ও আমিই করতাম। এটাতেই ডনের প্রধান বাবুল আহমেদ সাহেবের প্রবল আপত্তি।ছবিতে আলগা চুল আইল্যশ লেন্স থাকলে আরও ভালো দেখায় কিন্তু এগুলো আমার কখনও ভালো লাগেনি।বলা যায় এই আপত্তির জন্যও আমি ক্যাসেট থেকে দূরে থেকেছি এবং আমার এই নীতি বদনাম হিসেবে ক্যাসেট পাড়ায় ছড়িয়ে যায়। আমার তাতে কিছুই আসে যায়নি।কিছু ব্যাপারে আমি খুবই কট্টর। তারপর ও আমার সে সময়ের জনপ্রিয় এবং ভয়ংকর ব্যাস্ত সুরকার শ্রদ্ধেয় প্রনব ঘোষের সুরে আরেকজন জনপ্রিয় গীতিকার কামরুজ্জামান কাজলের লেখায় সঙ্গীতা অডিও কোম্পানি থেকে একটি ক্যাসেট বের হলো। খুবই দুঃখের ব্যাপার যে সেই ক্যাসেটের নাম মনে নেই এবং আরও ভয়ংকর দুঃখের বিষয় যে সেই ক্যাসেটের একটা গান ও আমার মনে নেই।কারণ একটা গানও মনে রাখার মতো ছিলো না।

এরপর আমি কিছু মিক্সড অ্যালবামে চারটা লালনগীতি গাইলাম। আমাদের সুপরিচিত কণ্ঠশিল্পী আবু সাঈদ জাহাঙ্গীর সেই গানগুলো কোলকাতা থেকে মিউজিক করে এনেছিলেন। গান গুলো খুবই সমাদৃত হয়।বাড়ির পাশে আরশীনগর,খাঁচার ভিতর অচীন পাখী, মানুষ ভবে নিষ্ঠা যার, মিলন হবে কতদিনে এই গানগুলো গেয়েছিলাম। তারপর আমি গাইলাম সঙ্গীতা অডিও কোম্পানি থেকে শ্রদ্ধেয় গীতিকবি মোহাম্মদ রফিক উজ জামান সাহেব ও জনপ্রিয় গীতিকার কামরুজ্জামান কাজল সাহেবের কথায় সুরসম্রাট আলাউদ্দিন আলী সাহেবের সুরে ” বিরহের স্বরলিপি “। সেই অডিও অ্যালবামে অনেক সুন্দর সুন্দর গান গেয়েছিলাম।নামভুমিকায় যে গানটি ছিলো সত্যিই অপূর্ব একটি গান। সেই অ্যালবামে একটি গান ছিলো ” গুন গুন গুন গুন গুঞ্জন ” ভীষণ নোটের খেলা।মেজর মাইনরের ঠাসবুনট! গানটি স্টুডিওতে তুলে দিয়েই আলী ভাই গাইতে বললেন। গাইতে গিয়ে দেখলাম মিউজিক ট্র‍্যাক করা হয়নি।আলী ভাই বললেন কনক,শুধু ক্লিকের উপর গাও।আমার হাজব্যান্ড বললেন এটা কিভাবে সম্ভব! আলী ভাই রেগে গিয়ে বললেন তুমি চুপ থাকো! কনক গাইবে।আমি ঠিক হেডফোন নিয়ে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালাম এবং দিব্বি গেয়ে দিলাম।আলী ভাই রেকর্ডিং প্যানেলে ডাকলেন।আমি গিয়ে বসলাম। আলী ভাই যেন চোখ বন্ধ, বললেন কাছে আয়,আমি চেয়ার টেনে একটু কাছে গেলাম,উনি চোখ বুঁজেই মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন পরীক্ষা নিলাম কিন্তু আমি হেরে গেলাম।বললেন দেখো মইনুল, আমার গাঁয়ে কাঁটা দিচ্ছে,এই গান কেউ গাইতে সাহস করবেনা এমন নোট দিয়ে তৈরি করেছি তারপর শুধু ক্লিকের উপর গাওয়া ভয়ংকর কঠিন! আমি সেদিন অনেক বড় উপহার পেলাম এ গানের মাধ্যমে।

এছাড়াও ” এ বুঝি তোমার ভালোবাসা নয়,আমায় কাঁদাতে শুধু অভিনয় ” ” তুমি ফিরে এলে তাই পাওয়ার আশায় আমি কাঁদলাম ” ” জীবন বীণা বাজেনা বাজেনা তুমি ছাড়া মন সাজেনা” ” তুমি দিনের আলো রাতের আঁধারে ” এই গানগুলো জনপ্রিয় হলো। মঞ্চানুষ্ঠানেও এগুলো গানের অনুরোধ আসতে লাগলো। সৌখিন গীতিকার আব্দুল বারি সাহেবের ” রক্তরাঙা সন্ধ্যারবি গোধুলিরে কয় সারাটি দিনের পরে এসেছে সময় ” জনাব মইনুল ইসলাম খানের সুরে গানটি অনেক জনপ্রিয় হবার পরে উনি আমাকে দিয়ে আস্ত একটি ক্যাসেট করালেন। এবার অবশ্য তিনিই গীতিকার ও সুরকার।সে ক্যাসেটের ” আবার আমি একা পান্থ এ ভুবনে ” গানটি জনপ্রিয় হলো। এইযে বলছি জনপ্রিয় হলো এটাকে আসলে তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রিয় দাবি করা ভুল হবে।গানগুলো শুধুই বোদ্ধা শ্রোতাদের জন্য।

মাঝেমধ্যেই আমি নানান জনের সঙ্গীতায়োজনে হারানো দিনের গান গেয়েছি, সেগুলোর হিসাব আমার কাছে নাই।এর পর আবু সাঈদ জাহাঙ্গীর ভাই ভারতীয় আধুনিক হারানো দিনের গান ও শচীন দেব বর্মন সাহেবের গানের দুটো ক্যাসেট কোলকাতা থেকে মিউজিক ট্র‍্যাক করে আনলেন।যথারীতি সুবোধ বালিকার মতো ঠিক ঠাক তুলে নিয়ে গাইলাম। সেই তালপাতার বাঁশি ক্যাসেটটি তুমুল আলোড়ন তুললো। বলা যায় ঝড়ই তুললো। শুনতে পাই দোকানে সিডি বিক্রির যুগের শেষ পর্যন্ত সিডিটি সমানতালে সারা পৃথিবীর বাংলা শ্রোতাদের কাছে সমাদৃত হয়েছে। তারপর জনাব মানাম আহমেদ, যাকে আমাদের কিবোর্ড বাদনের রাজা বলা যায়, বলা হয়ে থাকে কিবোর্ডে তিনি মায়া ঢালেন, তার সুরে মিক্সড ক্যাসেটে গাইলাম শ্রদ্ধেয় গীতিকবি জনাব শহীদুল্লাহ্ ফরায়েজী সাহেবের কথায়  “আমি পালাবো কোথায় ” গানটি, বলাই বাহুল্য অনেক জনপ্রিয় হলো। দেশ বিদেশে অনেক জায়গায় এমনকি গ্রামে গঞ্জেও আমি এই গানের অনুরোধ পাই।

আমি আমাদের সদ্যপ্রয়াত শ্রদ্ধেয় সুরকার জনাব সেলিম আশরাফ সাহেবের সুরে দুটি দেশের গান গেয়েছি। গানদুটো হলো অনেক প্রবীণ গীতিকবি মোহাম্মদ মোজাক্কের সাহেবের কথায় ” আমার গাঁয়ের পঞ্চবটীর তলায় ” আরেকটি ” ও মা তুমি বলোনা ওরা কেন শহীদ হলো ” গান দুটো সত্যিই আমার গানের ভান্ডারে অন্যরকম মাত্রা যোগ করলো। প্রাণের চেয়ে প্রিয় ও সম্মানিত পাঠকবৃন্দ বাকী গল্প আরেকদিন বলি, কি বলেন…।(চলবে)

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com